এলম হলো নবীদের রেখে যাওয়া সম্পদ

এলম হলো নবীদের রেখে যাওয়া সম্পদ

শরিয়তের জ্ঞানে ঋব্ধ আলেমরা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তারা হেদায়েত আঁকড়ে থাকেন। প্রত্যয়ে অটুট থাকেন। তাদের আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের সঙ্গেই। ‘হে ঈমানদাররা! আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা ‘কর্তৃত্বসম্পন্ন’ (ন্যায়পরায়ণ শাসক ও আলেম) তাদের। তারপর যদি তোমরা কোনো বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি প্রত্যর্পণ করো। যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের ওপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।’ (সূরা নিসা : ৫৯)।

আল্লাহ আলেমের মর্যাদা উচ্চতর করেছেন। তাদের বানিয়েছেন নিজ তাওহিদের অন্যতম সাক্ষ্য। ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতারা এবং ন্যায়নিষ্ঠ আলেমরাও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৮)। জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে যেতে হয় তাদের কাছেই। সমস্যা নিরসনেও দ্বারস্থ হতে হয় তাদেরই। ‘অতএব আলেম-জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো, যদি তোমাদের জানা না থাকে।’ (সূরা নাহল : ৪৩)। ‘বলুন, যারা জানে (আলেম) এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে?’ (সূরা জুমার : ৯)। ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা আলেম বা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।’ (সূরা মুজাদালা : ১১)। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে, ফেতনা ও পরীক্ষায়, হতাশা ও অন্ধকারে আলেমদের কাছে ছুটে যেতে হয়; সংকটে তাদের কাছে ভরসা খোঁজা হয়। ‘আর যখন তাদের কাছে শান্তি কিংবা ভীতিজনক কোনো বিষয় আসে, তখন তারা তা প্রচার করে। আর যদি তারা সেটি রাসুলের কাছে এবং তাদের কর্তৃত্বের অধিকারীদের (শাসক-আলেমদের) কাছে পৌঁছে দিত, তাহলে অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা তা উদ্ভাবন করে তারা তা জানত।’ (সূরা নিসা : ৮৩)।

আলেমদের বৈঠকগুলো মর্যাদা ও কল্যাণপ্রসূ। তা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কাজে আসে। উদাসীনতা থেকে রক্ষা করে। তারা ধর্মীয়-বিধানের মূলনীতি উদ্ভাবন করেন। হালাল-হারামের নীতিমালা নির্ধারণ করেন। তাদের কাছে মানুষের প্রয়োজন পানাহারের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) বলেন, ‘খাদ্য ও পানীয়ের চেয়ে মানুষের বেশি প্রয়োজন এলমের। কারণ খাদ্য ও পানীয়ের প্রয়োজন দিনে দুই-তিনবার। আর এলমের প্রয়োজন অনুক্ষণ।’

তাদের উত্তম শিক্ষাদানের ফলে ভালো শিক্ষা সম্পন্নকারী বের হয়। তাদের ওয়াজ-উপদেশে বিচ্যুতিকারীরা ফিরে আসে। তাদের প্রজ্ঞাপূর্ণ পন্থায় ঈমানের স্বচ্ছতা ফুটে ওঠে। সমস্যা-সংকটে অবস্থানের দৃঢ়তা দীপ্ত হয়। তারা বান্দাদের মধ্যে তারকাস্বরূপ। দেশ-সমাজের মিনারসদৃশ। তারা দয়াময়ের বন্ধু। তারা শয়তানের ত্রাস। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, ‘আলেমরা যদি আল্লাহর অলি না হন, তবে আল্লাহর কোনো অলিকে আমি চিনি না।’

তাদের পুঁজি মৃত্যুর পরও সচল থাকে। তাদের প্রতিদান বিদায়ের পরও চলমান থাকে। যারা তাদের অনুসরণ করেন, তাদের দেখানো পথে চলেন, তারা তার বিনিময় লাভ করেন। তাদের মজলিসগুলো ফেরেশতা দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। আসরগুলো রহমতে আবৃত থাকে। সমাবেশগুলোর ‘সাকিনা’ অবতীর্ণ হয়। তাদের সঙ্গে বসলে আল্লাহ তাদের কথা ফেরেশতাদের সগর্বে বলে থাকেন। যারা আলেমদের অনুসরণ করে, হেদায়েত পায়। যারা তাদের অবাধ্য হয়, পথভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তিতে পড়ে। তাদের জ্ঞানই জ্ঞান। তাদের কথাই কথা। তাদের মতই মত। নিম্নোক্ত আয়াতগুলোর বিন্যাস ভেবে দেখুন। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই শুধু তাঁকে ভয় করে।’ (সূরা ফাতির : ২৮)। তারপর বলেছেন, ‘এটা (জান্নাত) তার জন্য, যে তার পালনকর্তাকে ভয় করে।’ (সূরা বায়্যিনা : ৮)। আর আগের আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারাই সৃষ্টির সেরা।’ (সূরা বায়্যিনা : ৭)।

এলম হলো নবীদের রেখে যাওয়া সম্পদ। এর উত্তরাধিকারী ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম (রা.)। তাদের পরে এর উত্তরাধিকারী হয়েছেন তাবেয়িরা। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তা চলে আসছে। আল্লাহ যত দিন চাইবেন এ ধারা বহমান থাকবে। তাই কোনো আলেম যদি তার কাছ থেকে এলম গ্রহণ করা এবং এলমের ওয়ারিশ বানানোর আগে মারা যান তবে সেটা দুর্ভাগ্যের বিষয়।

সৌভাগ্যের বিষয় আলেমদের সম্মান করা। উত্তম বাক্যে তাদের আলোচনা করা। তাদের নিয়ে কটূক্তি প্রতিরোধ করা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সে আমার উম্মত নয়, যে আমাদের বড়দের সম্মান করে না; ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলেমদের প্রাপ্য মর্যাদা প্রদান করে না।’ (তাবারানি)। আবু দারদা (রা.) বলেন, ‘ব্যক্তির প্রজ্ঞার পরিচায়ক হলো এলমের অধিকারীদের সঙ্গে ওঠাবসা ও তাদের কাছে যাতায়াত করা।’ আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমি ওমর (রা.) কে একটি হাদিস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে গিয়ে ২ বছর অপেক্ষা করেছি। তার হায়বত ও ব্যক্তিত্ব আমাকে বাধা দিয়েছে।’ তাউস বিন কিসান বলেন, ‘চার ব্যক্তিকে সম্মান করা স্বতঃসিদ্ধ সুন্নত : আলেম, প্রবীণ ব্যক্তি, শাসক ও বাবা। এটা তোমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) এর সুন্নত।’

৮ রজব ১৪৩৭ হি. মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 4 =