কারবালায় ইমাম হোসাইনের ভাষণ

কারবালায় ইমাম হোসাইনের ভাষণ

(কারবালার ময়দানে তৃষ্ণার্ত ইমাম বাহিনী এক প্রান্তে অপর প্রান্তে ওমর বিন সা’দের বিশাল বাহিনী। এ অবস্থায় শত্রু সৈন্যদের উদ্দেশে ইমাম হোসাইন তার তরবারির ওপর ভর দিয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ভাষণ প্রদান করেন।)

কারবালায় আপন তাঁবুতে এক সময় ইমাম হোসাইন (রা.) মাটিতে বসে পড়েন। হঠাৎ তার ঘুম এসে যায়। কিছুক্ষণ পরই ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। হজরত জয়নবকে (রা.) লক্ষ্য করে বলেন, প্রিয় বোনটি আমার! নানা রাসূলে খোদা (সা.), পিতা আলী (রা.), মা ফাতেমা (রা.) ও ভাই হাসান (রা.)কে স্বপ্নে দেখেছি। আমাকে বলেছেন : ‘হে হোসাইন। খুব শিগগিরই আমাদের সঙ্গে মিলিত হবে।’ কোনো কোনো বর্ণনা মতে তারা বলেছিলেন- ‘হে হোসাইন (রা.) আগামীকালই আমাদের সঙ্গে মিতিল হবে।’ জয়নব (রা.) এ কথা শুনে মাথায় হাত চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠলেন। হোসাইন (রা.) বললেন। চিৎকার দিও না, এমন কাজ কর না যাতে জনগণ আমার দুর্নাম করে।

রাত এসে গেল। জীবনের সর্বশেষ রাতে হোসাইন (রা.) তার সাথী-সঙ্গীদের সমবেত করে মহান আল্লাহর প্রশংসার পর বললেন-
আমি আমার সাথী-সঙ্গীদের চেয়ে কোনো সাথীকে অধিক নেককার এবং আমার আহলে বায়েত (রা.) চেয়ে কোনো পরিবারকে অধিক উত্তম মনে করি না। মহান আল্লাহ তোমাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন। এখন রাত অন্ধকার সব কিছু ছেয়ে ফেলেছে। তোমরা এ রাতের অন্ধকারকে পথিকের উটের মতো মূল্য দাও। তোমরা সবাই আমার আহলে বায়েতের এক একজনকে নিয়ে রাতের আঁধারে পালিয়ে যাও। আমাকে শুধু শত্রুসেনাদের সামনে থাকতে দাও, কেননা তারা একমাত্র আমাকেই চায়।

নাসেখুত তাওয়ারিখ গ্রন্থে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বক্তব্যের বর্ণনা এরকম- ইমাম হোসাইন (রা.) তার বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমি তোমাদের থেকে বায়েত (আনুগত্যের শপথ) তুলে নিলাম। তোমরা নিজের পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যাও।’ এরপর আহলে বায়েত (রা.)-এর উদ্দেশে বলেন- ‘তোমাদেরকেও যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি। এ বিশাল বাহিনীর মোকাবেলায় যুদ্ধ করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। কেননা প্রতিপক্ষ সংখ্যা ও সাজসরঞ্জামের দিক থেকে তোমাদের তুলনায় অনেক বেশি। তাদের এ সেনা পরিচালনাও আমাকে হত্যা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমরা আমাকে এ সেনাবাহিনীর সামনে অবস্থান নিতে দাও। আল্লাহ সর্বাবস্থায় আমার সাহায্য করবেন। তার রহমতের দৃষ্টি আমার ওপর থেকে উঠিয়ে নেবেন না। যেমন আমার পূত পবিত্র পূর্ব পুরুষগণ থেকে তার দৃষ্টি তুলে নেননি। এ ভাষণের পর ইমাম বাহিনীর অনেকেই চলে যান। তবে তার আত্মীয়স্বজন তার সঙ্গে থেকে যান।

মুরুজুজজাহাব গ্রন্থের মতে- এ ভাষণের পর হোসাইন (রা.)-এর বাহিনীর ১১শ লোকের মধ্যে তার পরিবারে ৭২ জন ছাড়া সবাই রাতের অন্ধকারে ইমামকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। হোসাইন (রা.)-এর ভাই, সন্তান ও আবদুল্লাহ জাফরের সন্তানরা বলেন ওঠেন-
কেন আপনাকে ছেড়ে চলে যাব এটা কি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য? মহান আল্লাহ আমাদের জন্য কখনও এমন দিন যেন না করেন।

এ বক্তব্যে প্রথম উপস্থাপন করেন আব্বাস বিন আলী (রা.)-এর পর আহলে বায়েত (রা.) সবাই তার কথায় সমর্থন করেন। এরপর হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) মুসলিম বিন আকিলের সন্তানদের উদ্দেশে বলেন, মুসলিমের শাহাদত তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়েছে। আমি তোমাদের চলে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি। অন্য বর্ণনা মতে ইমামের ভাষণ শোনার পর আহলে বায়েত সমস্বরে বলতে লাগল-
হে আওলাদে রাসূল, মানুষ আমাদের কী বলবে? আর আমরা জনগণকে জবাবই বা কী দেব? আমরা কী বলব আমাদের নেতা আমাদের বুজুর্গ এবং মহানবীর সন্তানকে একা ফেলে এসেছি? তার সাহায্যে দুশমনের দিকে একটি তীরও নিক্ষেপ করিনি? বর্শা কাজে লাগাইনি, তরবারি চালাইনি? খোদার কসম আপনাকে ছেড়ে যাব না। নিজের জীবন দিয়ে হলেও আপনার প্রতিরক্ষা করব, প্রয়োজনে আল্লাহর রাহে আপনার সঙ্গে শাহাদাতের শরবত পান করব। আপনার শাহাদাতের পর আমাদের বেঁচে থাকাকে আল্লাহ অকল্যাণজনক করুন।

গ্রন্থনা : ইবনে তাউসের শাহাদাতে কারবালা ও ইমাম হোসাইন গ্রন্থ থেকে

লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামি চিন্তাবিদ, গদিনশীন পীর, দরবারে আউলিয়া সুরেশ্বর দায়রা শরিফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × two =