যে শিক্ষায় সুশোভিত বাংলাদেশ

যে শিক্ষায় সুশোভিত বাংলাদেশ
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা সমান নয় (আল-কোরআন)। নবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সে উত্তম যে নিজে কোরআন শিখে এবং অপরকে শেখায় (আল-হাদিস)। মাদ্রাসা শিক্ষা দ্বীনি শিক্ষার ক্ষেত্রে যুগে যুগে অবদান রেখে আসছে ও খোদাভীরু লোক তৈরি করছে।

বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষা আধুনিকায়ন হয়ে ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানের উপযোগী শিক্ষা প্রদান করছে। বর্তমানে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় সাধারণ বইগুলো একই বইপাঠ্য। দশম শ্রেণী পর্যন্ত বই সরকারিভাবেই সরবরাহ করা হয়। সাধারণ শিক্ষায় একটি বিদেশি ভাষা ইংরেজি।

শিক্ষার্থীরা সাধারণত এ বিষয়ে ফলাফল খারাপ করে থাকে। অপরদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ইংরেজির পাশাপাশি আরও একটি বিদেশি ভাষা আরবি শিখতে হয়। দু’টি বিদেশি ভাষার মুখোমুখি হওয়ার পরও মাদ্রাসার ছাত্ররা বরাবরই পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে সাধারণ শিক্ষার ফলাফল থেকে ভালো করছে। সাধারণ শিক্ষায় বারংবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটলেও মাদ্রাসার ক্ষেত্রে তা দেখা য়ায় না।

মাদ্রাসার পাঠ্য বিষয় সাধারণ শিক্ষার তুলনায় বেশি। এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রকে ১৩০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়, একই সমমানের মাদ্রাসা ছাত্রকে ১৭০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। মাদ্রাসায় মানসম্মত শিক্ষা দেয়া হচ্ছে তার বড় উদাহরণ হল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল।

গত কয়েক বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যাবে, অধিকাংশ বছরই মাদ্রাসা ছাত্র প্রথম স্থানসহ অনেক শীর্ষস্থান দখল করেছে।

২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে ২য় স্থান অধিকারী মাদ্রাসা ছাত্র আবদুল খালেক। সে বছর মেধা তালিকার প্রথম দশজনের চারজনই মাদ্রাসার ছাত্র।

২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে প্রথম হন মাদ্রাসা ছাত্র আবদুল আলীম, ২য় হন মাদ্রাসার ছাত্র সেলিমুল কাদের, ৩য়, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম, ১০ম, ১৭তম, ১৮তম হন মাদ্রাসার ছাত্র, একই বছর ‘ঘ’ ইউনিটে প্রথম মাদ্রাসার ছাত্রী এলিছ জাহান, ২য় মাদ্রাসার ছাত্র মিজানুল হক, ৪র্থ ও ১১তম হন মাদ্রাসার ছাত্র।

২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে ১ম হন মাদ্রাসার ছাত্র মাসরুর বিন আনসারী, ২য়, ৪র্থ, ৫ম, ১৬তম, ১৭তম, ১৮তম হন মাদ্রাসার ছাত্ররা।

একই বছর ‘ঘ’ ইউনিটে প্রথম মাদ্রাসার ছাত্র আসাদুজ্জামান, ২য় স্থানও দখল করে মাদ্রাসার ছাত্র। এরপর মাদ্রাসার ছাত্ররা যেন প্রতিযোগিতা করতে না পারে তার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০০ নম্বর করে বাংলা-ইংরেজি সিলেবাসে থাকার শর্ত করে দেয়। এতদিন মাদ্রাসায় আরবি প্রাধান্য থাকায় ১০০ নম্বর করে বাংলা-ইংরেজি ছিল। ১০০ নম্বর পড়ে মাদ্রাসার ছাত্ররা ২০০ নম্বর পড়ুয়া স্কুল-কলেজ ছাত্রদের থেকে মেধায় এগিয়ে থাকার প্রমাণ দিলেও শর্তারোপের কারণে বাধ্য হয়ে মাদ্রাসার মূল আরবি শিক্ষা কিছুটা সংকুচিত করে স্কুল-কলেজের মতো ২০০ নম্বর করে বাংলা-ইংরেজি মাদ্রাসার সিলেবাসভুক্ত করা হয়। এরপরও থেমে নেই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অগ্রযাত্রা।

২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে (পাসের হার ছিল ৯.৯৮) ‘ঘ’ ইউনিটে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম হন মাদ্রাসার ছাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন, মানবিক শাখা থেকে ১ম হন মাদ্রাসার ছাত্র রিফাত হোসেন।

২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটে প্রথম স্থান অধিকার করে মাদ্ররাসা ছাত্র আবদুল্লাহ মজুমদার। তাছাড়া মেধা তালিকায় স্থান নেয়া সাধারণ শিক্ষার অনেকে এসএসসি পর্যন্ত মাদ্রাসায় পড়ে কলেজে ভর্তি হয়ে এইচএসসি পাস করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাস্থান প্রাপ্তদের গড়ে সব বোর্ডে ভাগ করে দিলে মাদ্রাসা বোর্ড পাবে প্রায় ৫ জন, বাকিদের ভাগে গড়ে ১ জন করেও পড়বে না। এভাবে মেধার পরিচয় দেয়ার পরও উচ্চশিক্ষিত সংকীর্ণমনা কিছু ব্যক্তির কারণে ভর্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাদ্রারাসা ছাত্র বিরূপতার শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন সময় সরকার মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও অবদান রাখলেও বাস্তবতায় সাধারণ শিক্ষায় সরকারের সাহায্যের তুলনায় তা একেবারে নগণ্য।

আপনি যে কোনো ইউনিয়ন পর্যায়ের একটি স্কুলে গিয়ে তাদের সরকার প্রদত্ত অবকাঠামো এবং একই ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসায় গিয়ে তাদের জন্য সরকারের প্রদত্ত অবকাঠামো, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে একটি কলেজের অবকাঠামো ও একই স্থানের সমমানের মাদ্রাসার অবকাঠামোর দিকে তাকালে তা বুঝতে পারবেন ১৯৯৪ সালে একই পরিপত্রে স্বতন্ত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। বেতন ছিল মাসিক ৫০০ টাকা। ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে প্রথমে বেতন স্কেলের অন্তর্ভুক্ত ও পরবর্তী সময়ে সরকারিকরণ করা হয়েছে। অপরদিকে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকের বেতন ৫০০ টাকার স্থলে বর্তমান সরকার ১০০০ টাকা করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে হয়তো বলা হবে- আমরা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন দ্বিগুণ করেছি; কিন্তু সে দ্বিগুণ বেতন একজন শিক্ষকের মাসিক ১০০০ টাকা হওয়া উপহাস ছাড়া আর কী? তাদের সংযুক্ত ইবতেদায়ির সমস্কেলে নিলে ইজ্জত কিছুটা রক্ষা পেত। দেশে হাজারও সরকারি স্কুল-কলেজ রয়েছে অথচ সরকারি মাদ্রাসা রয়েছে মাত্র ৩টি।

বর্তমান সরকার ছয় শতাধিক স্কুল-কলেজকে নতুন করে সরকারিকরণের ঘোষণা দিলেও একটি মাদ্রাসাকে সরকারিকরণের ঘোষণা দেয়া হয়নি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে আমার জানামতে, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, অথচ সাধারণ শিক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে বিশ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ছোট রাষ্ট্র, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি, এদেশে চাকরির বাজার খুবই সীমিত। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে কর্মসংস্থানের অভাব থাকায় তারা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের বিশাল শ্রমবাজার।

বৈদেশিক মুদ্রা যা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে তার সিংহভাগ আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের ভাষা আরবি, আরবি জানা না থাকলে সেখানে গিয়ে ভালো চাকরি ও বেতন পাওয়া কঠিন। ভাষা শিখতে শিখতে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে মাদ্রাসার ছাত্ররা ব্যতিক্রম, তারা সহজে ভাষা আয়ত্ত করে নেয়।

আজকের মাদ্রাসার শিক্ষিতরা মসজিদে জুমার খুতবায়, শ্রেণী কক্ষে, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে, কোরআন ও হাদিসের আলোকে সুন্দর সমাজ গঠনে জনগণকে সচেতন করছে। এত কিছুর পরও সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসা ছাত্রদের সুবিধা কম পাওয়া দুঃখজনক।

লেখক : অধ্যক্ষ, ফুলগাঁও ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + 12 =