মিয়ানমারের নির্যাতিত মুসলিমদের দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে

মিয়ানমারের নির্যাতিত মুসলিমদের দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে

মিয়ানমার সেনাবাহিনী, মগ দস্যু, সরকারি হায়েনা বাহিনী ও বিজিপি মুসলিম সাম্প্রদায়কে তথা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নির্মূল অভিযান চালাচ্ছে। ধর্ষণ, লুটপাট, নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, জ্বালাও পোড়াও, অত্যাচার, জুলুম, বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।

নারী-পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। এমনকি নিষ্পাপ আসহায় শিশুগুলোকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের বিভিন্ন নদীতে ভাসছে মুসলমান শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার লাশ।

মগ দস্যু, সেনা, বিজিপি ও স্থানীয় রাখাইনরা যৌথভাবে আল্লাহতে বিশ্বাসী রোহিঙ্গাদের যাকে যেখানে পাচ্ছে সেখানেই আঘাত করছে, বেধম মারধর করে হাত-পা বেঁধে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করছে। নারীদের অবাধে করছে ধর্ষণ। মায়ের সামনে মেয়েকে, মেয়ের সামনে মাকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে নির্বিচারে হত্যা করছে সরকারি বর্বর বাহিনী। পাশাপাশি রোহিঙ্গা মুসলিমদের সম্পদ ও তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারছে।এলাকাগুলো থেকে অমুসলিমদেরকে সরিয়ে নিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের রেখে পুরো গ্রাম ঘেরাও করে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে এবং মর্টার গুলি ছুঁড়ছে।

গ্রামের পর গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে বহু মসজিদ ও মাদরাসা। নারকীয় হত্যা ও অগ্নিসংযোগেরে এক ভীতিকর মুহূর্তে আহত, অসহায় ও বিপন্ন আজ রোহিঙ্গা মুসলমানদের জীবন।

কেও কি বলতে পারেন, সদ্যজন্ম নেয়া নিস্পাপ সন্তানটির অপরাধ কী? তার লাশ কেন ভেসে উঠছে নদীতে? কী অপরাধ সন্তানসম্ভবা মায়েদের ?

এর আগে গত বছরের জুন-অক্টোবরেও রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর বয়ে গেছে হত্যা, ধর্ষণ ও আগুনে পোড়ানোর নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ। চালানো হয়েছে গণহত্যা।

কোনো কোনো সূত্রের মতে, মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্যে নিপীড়ন, নির্যাতনে গত শুক্রবার থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে।

নির্দ্বিধায় বলা যায়, রোহিঙ্গারাই এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে করুণ, লাঞ্ছিত ও আশাহীন জনগোষ্ঠী। তারাই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী।

মিয়ানমারের আরাকানে (বর্তমানে রাখাইন প্রদেশ) হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলমানদের বাস। বেশ কয়েকবার এ এলাকাটি আক্রান্ত হয়, স্বাধীনতা হারায়, নির্যাতিত হয়। সে হিসেবে আরাকানে মুসলিম নিধন ও নির্যাতন অনেক পুরানো একটি বিষয়। তবে গত পৌনে এক শতাব্দীকালে এই নির্যাতনের মাত্রা অনেক বেড়েছে। ১৯৩৭ থেকে ২০১২ পর্যন্ত মুসলিমদের টার্গেট করে শতাধিক ছোট-বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সহিংসতা ও সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। এ কারণে বহু রোহিঙ্গা স্বদেশত্যাগে বাধ্য হয়। রোহিঙ্গা মুসলমান মগ দস্যুদ্বারা ব্যাপক নিপীড়নের শিকার হয় ১৯৭৮ ও ১৯৯১ সালেও।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনসমূহের কাছে মুসলিম গণহত্যার জন্য দায়ী অং সান সুচি দাবি করে যে, ‘মুসলমানরা আক্রমণ করার কারণে এই অভিযান’। তার এই দাবি পুরোপুরি মিথ্যা, ষড়যন্ত্রমূলক ও রহস্যজনক। কারন যে মুসলিম জাতি আরাকানে ছন্নছাড়াভাবে বসবাস করছেন, যেখানে একাধিক রোহিঙ্গা একসাথে একত্রিত হয়ে কথাও বলতে পারেনা, সেখানে এ আক্রমণ করার মত শক্তি সাহস তাঁদের থাকার কথা নয়। নেইও।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বড় দেশগুলোর ভূমিকা বিবৃতির মাঝেই সীমাবদ্ধ। গত জুন-অক্টোবরের দাঙ্গার সময় বড় কয়েকটি দেশ ও জাতিসংঘ মিয়ানমার সরকারের ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করে নি। আজো করছে না।

এবার উল্টো চিত্র দেখা যাক। রোহিঙ্গাদের বদলে মিয়ানমার থেকে যদি সংখ্যালঘু হিন্দু, খ্রিস্টান কিংবা সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন জাতিগত নিপীড়নের শিকার হতো ! (যা আমরা চাই না)। তবে আজকের বিশ্বের শারীরিক ভাষা কি একই হতো? তারা কি একই আচরণ করতো ?

মিয়ানমার সরকার আগুন লাগিয়ে নিজেদের দেশের নাগরিক সংখ্যালঘু মুসলমানদের নির্বিচারে পুড়িয়ে মারছে। রোহিঙ্গরা নিপীড়িত ও দুর্বল। তাদের আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বর্বরতার প্রতিবাদ করা আমাদের দায়িত্ব। জীবনের ঝুঁকিতে থাকা বিপন্ন মানুষকে, বিপদ্গ্রস্থ মুসলিমকে বুকে জড়িয়ে নেয়া আমাদের কর্তব্য। এখন মুসলিম বিশ্বের চোখ বন্ধ করে, কানে আঙ্গুল দিয়ে থাকার সুযোগ নেই। মিয়ানমারের বর্বরতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ করে বিভিন্নমুখী তৎপরতা ছাড়া গত্যন্তর নেই মুসলিম বিশ্বের সামনে।

মুসলিমরাষ্ট্রগুলোর নৈতিক দায় এবং ভ্রাতৃত্বের টান অনেক বেশী থাকা আবশ্যক। ইসলামী রাষ্ট্রগুলো তাদের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। পারবে না।

রোহিঙ্গারা আমাদের ভাই। মুমিন ভাই। আজ তাদের দেহ রক্তাক্ত। অশ্রুতে ভেজা তাদের প্রতিটি আঁখি। এই লাখো ভেজা আঁখির অশ্রু মোছার দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে।

মহান আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট।

লেখক: মুফতী ফয়জুল্লাহ, মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × three =