লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক

লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক

পবিত্র কালামে পাকের সূরা তওবার ৩৬ নং আয়াতের ভাবার্থে দেখতে পাই সৃষ্টির প্রথম দিনেই লওহে মাহফুজে আরবি বারো মাসের নাম লিপিবদ্ধ ছিল। তবে মাসগুলোর ধারাবাহিকতা আসমান ও জমিন সৃষ্টির পর মুহূর্তে হয়েছে। তার মধ্যে জিলকদ, জিলহজ, মহরম ও রজব- এ চার মাস বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন। মুসলিম জাতির কাছে হারাম বলে চিহ্নিত এমন কোনো গর্হিত কাজ এ মাসগুলোতে করা যায় না। মাসগুলো খুব বরকতময়। এতে ইবাদতের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

পবিত্র জিলকদ ও জিলহজ মাস আমরা পেতে যাচ্ছি। পবিত্র বাইতুল্লায় যারা হজে অর্থাৎ বিশ্ব সম্মেলনে যোগদান করতে যাবেন তাদের সফরের কার্যক্রম এ জিলকদ মাস থেকেই শুরু হয়ে গেছে। নিজেকে গোছানোর কাজে লেগে যাবেন হাজীরা।

লাব্বাইক বলে তালবিয়া পড়া শুরু করবেন অন্তরের ভেতর থেকে। কারণ এ তালবিয়াহই হজ যাত্রাপথের সব রকমের মুশকিল আসান করে দেয়। তিরমিজি শরিফে আছে ‘যখন মুমিন বান্দা তালবিয়াহ পড়ে, তখন তার ডানে আল্লাহর যত সৃষ্টি থাকে, গাছ হোক আর পাথর হোক, সবাই তার সঙ্গে ‘লাব্বাইক’ বলে। এমনকি এদিক-ওদিকের সব জমিনই বিস্তৃত হয়ে যায়।

যুগশ্রেষ্ঠ সুফি সাধক সৈয়দ রশীদ আহমেদ জৈনপুরী (র.) বলেন, যারা হজে যেতে পারছেন না তারাও হজের মৌসুমে নিজ স্থানে থেকে এ তালবিয়াহ পাঠ করলে প্রচুর সওয়াবের অধিকারী হবেন। হজযাত্রীরা দুরু দুরু বুকে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যাতে আল্লাহপাকের অপছন্দনীয় কাজ তাদের দিয়ে হয়ে না যায়। পৃথিবীর মধ্যস্থল সেই মক্কানগরীতে অবস্থিত বাইতুল্লাহ হয়ে তারা হাজিরা দেবে।

যেখানে পৃথিবীর সব আল্লাহ প্রেমিক হাজিরা দিয়ে গেছেন। কালো কাপড়ে সোনার সুতায় বোনা কারুকার্যে আচ্ছাদিত প্রেমময়ের পবিত্র গৃহ দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে যাবে। বহুদূরে অবস্থিত নিজ আবাসস্থল থেকে যার দিকে মুখ করে সেজদা করে চলেছিল প্রতিনিয়ত, আজ দূরত্বের সব পর্দা সরিয়ে খুব কাছে আরাধ্য সেই খোদার আলয়টি দেখে মনে হবে এত আপন আর কে হতে পারে। চিরচেনা মনে হবে।

তাওয়াফের মাঝে হৃদয়ের সব আকুতি প্রকাশিত হবে। গভীর নিশিথে আল্লাহ পাকের প্রিয়জনদের সঙ্গে তাওয়াফ করার সৌভাগ্য অর্জন করবে। ফায়েজে ফাইজিয়াত হয়ে যাবে সে। আশিক বান্দার আকুতিতে প্রভু ও লাব্বাইকা ইয়া আব্দি অর্থাৎ হে আমার প্রিয় আমিও তোমার জন্য হাজির।

এ মধুমাখা পবিত্র বাণী শুধুই প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে। তৃতীয় ব্যক্তির কানে তা পৌঁছাবে না। কাবা আল্লাহতায়ালার গৃহ হওয়ার কারণে তার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ খোদায়ী দিদারের আগ্রহ বাড়ে কাবা দর্শনের মাধ্যমে। তাই এ পবিত্র গৃহ দর্শনের প্রতিশ্র“তি সওয়াব লাভের আকাক্সক্ষা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে প্রেমময়ের প্রেম লাভের আকাক্সক্ষা করা দরকার।

মহোৎসবে যোগদান করতে আরাফাহর মাঠে একত্রিত হবে সফেদ পোশাকে সারা বিশ্বের মুসলিম। শ্বেতকায়, কৃষ্ণকায় একই প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ। সবাই ইহরাম পরিহিত, এক বেশ, এক পরিচ্ছদ আর সবার মুখে লাব্বায়েক আল্লাহুমা লাব্বায়েক … লা শারিকা লাক। কারও মাঝে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।

সবাই সেদিন হৃদয়ের মলিনতা মুছে ফেলতে চাইবে। আগামীতে ভালো কাজ করার অঙ্গীকার করবে। অশ্রু বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ধুয়ে ফেলতে চাইবে জীবনের সব কালিমা। সেদিন পাহাড়ে, জমিনে, গাছে, আকাশে-বাতাসে সর্বত্র উচ্চারিত হতে থাকবে একমাত্র লাব্বায়েক ধ্বনি। এ ছাড়া আর অন্য কোনো রব বা শব্দ শোনা যাবে না। হাজীরা অশ্রু -প্রবাহের মাঝে হৃদয়বিদারক অনুতাপ করতে থাকবে। যত অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনায় মগ্ন থাকবে।

এ বিশ্ব সম্মেলনে রাসূল (সা.) ওসিলায় নেক্কার বান্দাদের দলে নাম লেখাতে চাইবে সবাই। সেদিন ভিন্ন আকারে সিদ্ধপুরুষরাও এ বিশ্ব সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে থাকেন, তাই কোনো কিছুকে আঘাত বা স্থানান্তর করা থেকে বিরত থাকতে হয়। নিজেকে রাখতে হয় মুর্দার মতো। কুতুব এবং আবদালরাও এ ময়দানে উপস্থিত থাকেন।

শয়তানের উদ্দেশে কঙ্কর মারার বিষয়ে হজরত সৈয়দ রশীদ আহমেদ জৈনপুরী (র.) বলেন, হজব্রত পালন করার সময় মানুষ শয়তানকে পাথর মারার প্রতিযোগিতায় প্রাণ পর্যন্ত দেয়; কিন্তু মানুষ জানে না যে প্রথম প্রস্তরটি কল্পনায় মারা উচিত তার নিজের দিকে- তার অন্তরে ওঁৎ পেতে থাকা নফসে আম্মারার দিকে।

আরাফাতের মাঠে উপস্থিত, মুজদালেফায় রাত যাপন, মিনাতে কঙ্কর নিক্ষেপ ও কোরবানি এবং মক্কায় ফিরে কাবা শরিফ তাওয়াফ এসব অনুষ্ঠান সমাহারে হজ। হজ বা উমরাহ নিয়মে মদিনা গমনের কোনো বিধি সরাসরি কিতাবে আসেনি বলে অনেকেই গুরুত্ব দিতে চান না। তবে মদিনা শরিফে রাসূল (সা.)-এর রওজা মোবারক জেয়ারতের ফলে এক নবপ্রেরণা এবং নবোদ্দীপনা রাসূল প্রেমিক হাজীরা লাভ করেন। রাসূলে পাক (সা.)-এর উক্তি যে ব্যক্তি হজ সম্পন্ন করল এবং আমার মৃত্যুর পর আমার কবর জিয়ারত করল সে যেন জীবদ্দশায়ই আমার জিয়ারত করল। [মিশকাত]

যিনি হজের পদ্ধতি জানিয়েছেন, তাকে বাদ দিলে হজ বা উমরাহ কীভাবে কবুল হবে? ভেবে দেখা দরকার। আমরা আমাদের প্রিয়জনদের কবর জিয়ারত করতে ব্যাকুল অথচ যার সাফায়াত ছাড়া কোনো ব্যক্তি মুক্তি পাবে না। কবরে প্রথমেই যাকে চিনি কিনা জিজ্ঞেস করা হবে তার মহান দরবারে দণ্ডায়মান হয়ে সশ্রদ্ধ সালাম জানাতে অনীহা কিসের?

অথচ রাসূল (সা.) আশিকরা তার দরবারে পৌঁছাতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করে প্রাণভরে হৃদয়ের আবেগ প্রকাশ করেন। তপ্ত অশ্র“তে বুক ভাসান, তাদের প্রাণ চায় এ পদযুগলে রূহকে উৎসর্গ করতে। দেহকে সমর্পণ করতে। সব চিন্তা, সব আশা, সব ভরসাকে চিরতরে বিদায় দিয়ে কেবল অশ্র“ প্রবাহে রওজা মোবারক ধৌত করতে, কেবল ক্ষমা চাইতে, কেবল অপরাধ স্বীকার করতে, আর নিজেকে কোরবান করতে। এভাবে তারা এক স্বর্গীয় আনন্দভরা হৃদয়ের অধিকারী হন। বুকভরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রেমোল্লাসপ্রাপ্ত হন হাজীরা।

হজের মতো আত্মোৎসর্গের আর দ্বিতীয় অনুষ্ঠান নেই। এতে আত্মার পরিশুদ্ধি হয়। নফস বশীভূত হয়, নির্মল শান্তি লাভ হয়। সম্মান লাভ হজের উদ্দেশ্য নয়। হজ তন্ময়তা লাভের প্রধান উপকরণ। যে হজ উদযাপনে স্ত্রী বা সন্তানাদির চিন্তায় ব্যস্ত থাকে উপার্জনের আকাক্সক্ষা, প্রশংসা লাভের ইচ্ছা ও স্বার্থসিদ্ধির লেশ থাকে সে হজ লৌকিক আচারে পরিণত হয়। সেটি তরিকতের হজ হয় না।

বাহ্যিক কাজ দিয়ে শরিয়ত মানা হয়। শরিয়তের নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজ একরকম আর তরিকতেরটি ভিন্ন। একটির সম্বন্ধ শরীরের সঙ্গে অপরটির সম্বন্ধ আত্মার সঙ্গে। ইসলামের শিক্ষা দুটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

খোদার ওয়াস্তে রূহের তরক্কির জন্য করলে তবেই তরিকতের হজ হবে। মুখে কলেমা তৈয়ব আবৃত্তি করা এক আর সব চিন্তা বাদ দিয়ে আল্লাহপাকের এককত্বে ডুবে যাওয়া আর এক। প্রথমটি শরিয়ত ও দ্বিতীয়টি তরিকত।

মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের শরিয়ত ও তরিকতের হজ পালন করার তৈফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + five =