বিজ্ঞানচর্চার উৎস কুরআন

বিজ্ঞানচর্চার উৎস কুরআন

বিজ্ঞানের জয়যাত্রার অর্থই হচ্ছে মানবসভ্যতা বিকাশের জয়যাত্রা।

বিজ্ঞান এবং ধর্ম উভয়ে উভয়ের মাপকাঠি তৈরি করছে। প্রতিনিয়ত দুটিকেই পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- বর্তমান বিশ্বে যতগুলো ধর্ম রয়েছে তার মধ্য থেকে শুধু ইসলাম ধর্মই তার স্বকীয়তা বজায় রেখেছে। ইসলামের কোনো একটি আয়াত (নিদর্শন) বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত সত্য আবিষ্কারের বিপরীত প্রমাণিত হচ্ছে না।

এমনকি বিজ্ঞান নিজেই অত্যাশ্চর্য ও বিস্মিত যে, পবিত্র কুরআন তাদের আবিষ্কৃত ফলাফল সেই দেড় হাজার বছর আগেই একজন উম্মি নবীর মুখ দিয়ে প্রকাশ করে দিয়েছে। এমনকি পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছে তা আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রমাণিত হচ্ছে।

পবিত্র কুরআনের বিজ্ঞানসম্মত আয়াত (নিদর্শন) রয়েছে যেসব এখনও অনাবিষ্কৃত, সে কারণে বিজ্ঞান আজ শূন্য হাতে পবিত্র কুরআনের সামনে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে পড়ছে। এতেই প্রমাণিত হচ্ছে যে, ইসলামধর্ম কল্পকাহিনী বা অসত্যনির্ভর নয় বরং এটি একটি বিজ্ঞানসম্মত মহাসত্যের ধর্ম।

বিজ্ঞানসম্মত ধর্মের একমাত্র স্রষ্টা তিনিই হবেন যিনি মহাজ্ঞানী-মহাবিজ্ঞানী।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- তিনিই ওই সত্ত্বা যিনি আসমানেও ইলাহ জমিনেও ইলাহ। তিনি মহাকৌশলী ও মহাবিজ্ঞানী। (সূরা যুখরূফ- ৪৩ঃ৮৪)

ইসলাম অন্যান্য ধর্মের মতো ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা করাকে অপরাধ মনে করে না। অথচ, খ্রিস্টধর্ম কর্তৃপক্ষ বহু শতাব্দী অহির খবর না জেনে না মেনে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির বিরোধিতা করেছে।

বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তারা। সেই ভয়ে অনেক বিজ্ঞানী গোপনে পালিয়ে নির্বাসনে চলে যেতেন। এ প্রসঙ্গে গ্যালিলিওর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

পৃথিবীর আবর্তন সম্পর্কিত কোপারনিকাসের আবিষ্কারকে সত্য বলে গ্রহণ করার অপরাধে চার্চ কর্তৃপক্ষ তাকে গুরুদণ্ড প্রদান করেন। সূত্র-ডা. মরিস বুকাইলি।

অন্যদিকে ইসলাম বিজ্ঞানচর্চায় এতটাই উৎসাহিত করেছে যে, পবিত্র কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিষয়াদি নিয়ে বিশদ চিন্তাভাবনা এবং গবেষণা করার জন্য বারবার তাগিদ দেয়া হয়েছে।

কুরআন বলছে- বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ। (সূরা ইয়াসিন-০২)

আমি কুরআন বুঝার জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি? (সূরা ক্বামার-১৭, ২২, ৩২, ৪০) কুরআন শরিফের বিভিন্ন আয়াতে এভাবে সম্বোধন করে বলা হয়েছে-

-আফালা তুবসিরুণ…/অর্থাৎ, তোমরা কি দেখতে পাও না?

-আফালা তাফাক্কারুন…/অর্থাৎ, তোমরা কি চিন্তা করো না?

-আফালা তাদাব্বারুন…/অর্থাৎ, তোমরা কি গবেষণা করো না?

কুরআনে আরও বলা হয়েছে- তিনি সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। তুমি করুণাময় আল্লাহতায়ালার সৃষ্টিতে কোনো তফাত দেখতে পাবে না। আবার দৃষ্টি ফেরাও; কোনো ফাটল দেখতে পাও কি?

(ক্ষমাশীল তিনি সপ্ত আকাশ রচিলেন থরে থরে, কোনো ত্র“টি হেরিবে না তাঁর পূর্ণ সৃজন পরে? চাহ তুমি তাঁর সৃষ্টি পানে, দেখ কিছু ভুল-চুক, ফেরাও তোমার নয়নখানি, ফেরাও তোমার মুখ।

(কাব্যানুবাদ : কাজী নজরুল ইসলাম)

অতঃপর তুমি বারবার তাকিয়ে দেখ তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও পরিশ্রান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে। (সূরা মুলক-৩-৪)।

মুসলিম মনীষীরা পবিত্র কোরআনুল কারিমে আল্লাহতায়ালার এসব নির্দেশ পেয়ে আয়াত নিয়ে গবেষণা করতে লাগলেন। যারা গবেষণায় আÍনিয়োগ করে সফল হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন-

আল বাত্তানি, আল বলখি, আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল কিন্দি, বানু মুসা, ইবনুন নাফিস, নুর আদ-দীন ইবনে ইসহাক আল-বেতরুগি, জাবির ইবনে হাইয়ান, আবু রায়হান আল-বিরুনি, আবু আলি সিনা, ওমর খৈয়াম, আবুনাসের মোহাম্মদ ইবনে ফারাখ আলফারাবি, আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমি, আবু আলী আলহাসান ইবনে আল হাসান আল ইবনে হাইসাম, মোহাম্মাদ ইবন জাকারিয়া আল রাযী বা আল-রাযী।

এবং মুসলিম মনীষীদের মধ্যে যারা ইতিহাসে যে যে জিনিস আবিষ্কার করেছেন তাদের নাম ও অবদান-

-রসায়নের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান/ বিশ্বের সেরা ভূগোলবিদ আল-বিরুনি/আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ইবনে সিনা/ হৃদযন্ত্রে রক্ত চলাচল আবিষ্কারক ইবনুল নাফিস/ বীজগণিতের জনক আল-খাওয়ারিজমি

-পদার্থবিজ্ঞানে শূন্যের অবস্থান নির্ণয়কারী আল-ফারাবি/ আলোক বিজ্ঞানের জনক ইবনে আল-হাইসাম/ এনালিটিক্যাল জ্যামিতির জনক ওমর খৈয়াম/ সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধারকারী আল-কিন্দি/ গুটিবসন্ত আবিষ্কারক আল-রাযী/ টলেমির মতবাদ ভ্রান্ত প্রমাণকারী আল-বাত্তানি।/ এলজাব্রায় প্রথম উচ্চতর পাওয়ার ব্যবহারকারী আবু কামিল/ ল’ অব মোশনের পথ প্রদর্শক ইবনে বাজ্জাহ/ ঘড়ির পেন্ডুলাম আবিষ্কারক ইবনে ইউনূস/ পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয়কারী আল-ফরগানি/ পৃথিবীর প্রথম নির্ভুল মানচিত্র অঙ্কনকারী আল-ইদ্রিসী।/ ত্রিকোণমিতির জনক আবুল ওয়াফা/ স্টাটিক্সের প্রতিষ্ঠাতা ছাবেত ইবনে কোরা/ পৃথিবীর আকার ও আয়তন নির্ধারণকারী বানু মুসা/ মিল্কিওয়ের গঠন শনাক্তকারী নাসিরুদ্দিন তুসি।/ বিশ্বের প্রথম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের আবিষ্কারক আল-জাজারি/ সূর্যের সর্বোচ্চ উচ্চতার গতি প্রমাণকারী আল-জারকালি/ বীজগণিতের প্রতীক উদ্ভাবক আল-কালাসাদি।

আজকের তুলনায় তখনকার মানুষ ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় অনেক বেশি প্রাণীত ছিল; কিন্তু এতে তাদের ঈমানদার ও বিজ্ঞানী হওয়ার পথে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি। বিজ্ঞান তখন ধর্মের দোসর ছিল এবং সেই অবস্থার পরিবর্তন মোটেই সঙ্গত হয়নি।

এ থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, বিজ্ঞানময় পবিত্র কোরআনুল কারিমে সৃষ্টির রহস্য লুকিয়ে আছে।

পবিত্র কুরআন নিজেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছে-

আলিফ-লাম-মিম। যালিকাল কিতাবু লা রাইবাফিহ। এ কিতাবের (কুরআন) মধ্যে (যা কিছু বর্ণনা করা হয়েছে তা সবই সত্য) কোনো সন্দেহ নেই। (সূরা বাক্বারা-০১-০২)।

অদূর ভবিষ্যতে পবিত্র কুরআনের আরও রহস্য উন্মোচন হবে। আগামীর মুসলমানদের জন্য যা গর্বের কারণ হবে।

সুতরাং আমাদের উচিত হবে, পবিত্র কোরআনুল কারিমের বর্তমান প্রচলিত তর্জমাগুলোকে বিজ্ঞানসম্মত এবং কুরআন ও হাদিসের সঠিক তর্জমা বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেয়া। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ যত রকম তথ্য দেয়া দরকার তা বিজ্ঞানভিত্তিক করে দিতে হবে। আল্লাহ আমাদের বোঝার এবং গবেষণা করার তাওফিক দিন।

লেখকজামাল আল সাবেত, প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × three =