ঋণ দেয়ার ফজীলত

ঋণ দেয়ার ফজীলত

মানুষের যোগ্যতা, ক্ষমতা, আকার-আকৃতি ইত্যাদির দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন পার্থক্য রয়েছে তেমনি রয়েছে পারস্পরিক নিবিড় ও গভীর সহযোগিতা। আর এ পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতারই একটি মাধ্যম হচ্ছে করজে হাসানা। স্বার্থহীনভাবে অন্যের হীত সাধনের লক্ষ্যে মহান প্রভুর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে অসহায়-সহায় সম্বলহীন ব্যক্তিকে বিনাশর্তে বিনিময়হীন ঋণ প্রদান করাকে ইসলামী শরিয়তের ভাষায় করজে হাসানা বলে। এটি মূলত সুদভিত্তিক ঋণের বিকল্প ব্যবস্থা।

মানবতার ধর্ম ইসলামে একদিকে যেমন সুদভিত্তিক ঋণকে হারাম করেছে। ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তোমাদের জন্য সুদ হারাম করেছেন। (সূরা বাকারা-২৭৫) অপরদিকে সুদের সুদভিত্তিক ঋণের বিকল্প হিসেবে করজে হাসানার বিধান প্রবর্তন করেছেন আল্লাহ। ইরশাদ হচ্ছে- কে আছে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ? তা হলে তিনি বহুগুণে একে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার (সূরা-হাদিদ-১১)

আয়াতে উত্তম ঋণের অর্থ হল নিঃস্বার্থভাবে ঋণ দেয়া (আল-কোরআনুল কারীম, ইফাবা) আল্লাহকে ঋণ প্রদানের অর্থ হচ্ছে, তাঁর বান্দাদের ঋণ প্রদান করা এবং অভাব দূর করা। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তথা তাঁর বান্দাদের ঋণ প্রদান করবে আল্লাহতায়ালা সেই ঋণদাতাকে দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী করবেন।

ইরশাদ হচ্ছে মুসলমানকে একবার ঋণ দিলে এ ঋণদান আল্লাহর পথে সে পরিমাণ সম্পদ দুইবার সদকা করার সমতুল্য। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, ইফাবা) ইসলামে করজে হাসানার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ঋণগ্রহীতা রিক্তহস্ত হলে তাকে অবকাশ দেয়া। ইরশাদ হচ্ছে আর যদি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি অভাবী হয় তা হলে তাকে সচ্ছলতা পর্যন্ত অবকাশ দেবে (সূরা-বাকারা-২৮০)। অধিকন্তু ইসলামে অভাবী ব্যক্তির ঋণ মওকুফকারীর জন্য রয়েছে প্রভূত কল্যাণের ঘোষণা। ইরশাদ হচ্ছে আর যদি মাফ করে দাও তা হলে সেটি তোমাদের জন্য অশেষ কল্যাণকর যদি তোমরা জানতে (বাকারা-২৮০) তবে হ্যাঁ ইসলাম যেমন স্বার্থহীনভাবে ঋণ প্রদানের উৎসাহ প্রদান করেছে তেমনি ঋণ আদায়ের ব্যাপারেও অত্যাধিক কঠোরতা অবলম্বন করেছে যা রাসূল আকরাম (সা.) এর কণ্ঠে এভাবে উচ্চারিত হয়েছে- আল্লাহতায়ালা কর্তৃক নির্দিষ্ট করে দেয়া পাপগুলো ব্যতীত মানুষের পক্ষে সবচেয়ে বড় পাপ হল ঋণগ্রস্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা এবং তা পরিশোধ করার উপযুক্ত সম্পদ রেখে না যাওয়া (আবু দাউদ)।

অন্যত্র তিনি বলেন, ঋণ পরিশোধে সক্ষম ব্যক্তি টালবাহানা করলে তাকে লজ্জিত করা এবং শাস্তি প্রদান জায়েজ। (আবু দাউদ, নাসায়ী) যারা অপরের মাল আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রহণ করে তাদের সম্পর্কে হাদিসে অত্যন্ত কঠোর ভাষার হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে যে ব্যক্তি অপরের মাল আত্মসাৎ করার নিয়তে ঋণ গ্রহণ করবে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করবেন (বুখারি)। ইসলামের প্রথম দিকে করজে হাসানা তথা বিনাসুদে ঋণ প্রদান কার্যক্রমটি ব্যক্তিগতভাবে প্রচলিত ছিল। সাহাবায়ে কেরাম এমনকি রাসূলে আকরাম (সা.) ও লোকদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুপাতে বিভিন্ন সময়ে বিনাসুদে ঋণ তথা করজে হাসানা গ্রহণ করতেন। পরবর্তীকালে হজরত উমর (রা.) তাঁর খেলাফতকালে বিনাসুদে ঋণ প্রদানের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সমাজে প্রচলন করেন।

এমনকি ইসলামের সোনালি যুগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে একটি বিশাল বরাদ্দ থাকত যা দরিদ্র, নিঃস্ব, অসহায় লোকদের করজে হাসানা তথা বিনাসুদে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যবহার হতো।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমরা পার্থিব জগতের লোভ-লালসার ফাঁদে পড়ে ইসলামের আদর্শের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে সুদভিত্তিক ঋণ প্রদানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি; করজে হাসানা তথা সুদবিহীন ঋণ প্রদানের মতো পুণ্যের কাজটি একেবারেই ভুলে গেছে সমাজ-জাতি এবং মুসলিম দুনিয়া। হে আল্লাহ আমাদের এ থেকে বাঁচার তৌফিক দান করুন।

লেখক : তরীকুর রহমান, প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 3 =