রোজা পালন করে প্রত্যেক প্রাণী!

রোজা পালন করে প্রত্যেক প্রাণী!

হে ঈমানদারগণ! ‘তোমাদের ওপর সিয়াম বা রোজার বিধান ফরজ করা  হয়েছে, তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও যেমনিভাবে রোজার বিধান ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা মোত্তাকি হতে পার।’

শুধু মানুষ নয়, সব প্রাণীকেই রোজা পালন করতে হয়। বেঁচে থাকার তাগিদেই তা করতে হয়। নতুবা প্রাণিকুল মরে যাবে। যেমন দরিয়ার মাছ একটি নির্দিষ্ট সময় খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। তিমি মাছের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। যারা সমুদ্রগামী তারা প্রায়ই লক্ষ্য করে থাকেন, তিমি মাছ সাগরে ভাসে। কোনো কিছুই খায় না। এক গবেষণায় দেখা গেছে, তিমি মাছ এভাবে বছরে কয়েক মাস না খেয়ে সাগরে ভাসে।

ডাঙ্গার সব প্রাণী এমনকি ক্ষুদ্র পিপীলিকাও রোজা পালন করে। তারা তাদের নিজস্ব নিয়মে রবের দেখানো নিয়ম অনুসারে রোজা পালন করে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আহার পরিত্যাগ করে নিজ নিজ বাসায় কয়েক মাস অবস্থান করে। তাদের শরীরের সব অবাঞ্ছিত জিনিস পরিশোধন হওয়ার পর তারা আবার নতুন উদ্যমে কাজ করা শুরু করে। এভাবে প্রত্যেকটি প্রাণী একটি নির্দিষ্ট সময় উপবাস পালন করে। সাপ, ব্যাঙ, প্রজাপতি  ইত্যাদি অনেক কিছুর নাম উল্লেখ করা যায়। এমনকি পাট ক্ষেতের বিছাগুলোও একটি নির্দিষ্ট সময় নিজেকে আবরণের ভেতর বন্দি রেখে উপবাসে যায়। উপবাস শেষে আবার তারা নতুন যৌবন পায় এবং কাজ করা শুরু করে। এভাবে প্রত্যেক প্রাণী তাদের রবের দেখানো পথে সিয়াম পালন করে বা করতে হয়।

মানুষের ওপর আল্লাহ পাক লিখিতভাবে সিয়াম ফরজ করেছেন। সিয়ামের পারলৌকিক বহু কল্যাণ থাকলেও ইহলৌকিক কল্যাণও অনেক। সিয়াম মানুষকে নব যৌবন দান করে। মানুষ যা খায় তাতে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, প্রোটিন, ফ্যাট, অ্যামাইনো এসিড ইত্যাদি শরীরে জমা হয়। শরীর তার আপদকালীন সময়ের জন্য এগুলো জমা করে রাখে। শরীর যখন অনেকক্ষণ ধরে খাদ্য পায় না, তখন তা কাজে লাগায়। কিন্তু ওই ভিটামিন, প্রোটিন, ফ্যাট, অ্যামাইনো এসিড ইত্যাদির একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। নির্দিষ্ট মেয়াদকালের মধ্যে শরীরকে সেগুলো ব্যবহার করতে হয়, নতুবা সেগুলো পয়োজন বা বিষক্রিয়ায় পরিণত হয়। ওইসব উপাদানের মেয়াদ থাকে এক বছর। এক বছরের মধ্যে ওইসব উপাদান ব্যবহৃত না হলে বিভিন্ন ধরনের রোগ যেমন, ক্যান্সার, রক্তে কলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের অসুখ, কিডনির অসুখ, লিভারের অসুখ, মূত্রথলির অসুখ ইত্যাদি অনেক রোগ হতে পারে। তা হলে ওইসব জটিল রোগ থেকে বাঁচার উপায় কী?

ওইসব জটিল রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল সিয়াম পালন করা। কারণ সিয়াম পালন করলে ওইসব উপাদান জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যায়। প্রশ্ন হতে পারে, কীভাবে?

মানুষ যে সাহরি খায়, তা শরীরে ৬ ঘণ্টার বেশি থাকে না। অথচ রোজার সময় মানুষ না খেয়ে থাকে অন্তত ১৪-১৫ ঘণ্টা। তা হলে শরীর ৬ ঘণ্টার পর খাবার পায় কোথায়? ওই যে বলছিলাম, শরীর তার আপদকালীন সময়ের জন্য খাবার অর্থাৎ ভিটামিন, ফ্যাট, প্রোটিন, অ্যামাইনো এসিড ইত্যাদি জমা করে রাখে। সেগুলো দিয়ে শরীর বেঁচে থাকে। বিগত ১১ মাস ধরে শরীর যা জমা করেছিল, রমজান মাসে শরীর তার সব ব্যবহার করে। এভাবে এক বছরের মধ্যে তার ব্যবহার হয়ে যায়। ফলে শরীর জবভরহবফ বা জবভৎবংযসবহঃ হয়। এভাবে সিয়াম পালনের মাধ্যমে শরীরকে প্রতিবছর জবভরহবফ বা জবভৎবংযসবহঃ করা যায়। শরীরে সজীবতা বা সতেজতা ফিরে আসে। শরীর নতুন যৌবন ফিরে পায়। সুতরাং শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য রোজা হল এক খোদায়ী বিধান। এ বিধান আমরা নিজেদের কল্যাণের জন্যই পালন করব।

যদি কেউ এ বিধান পালন না করেন, তা হলে আল্লাহ পাক তাকে বাধ্য করান সে বিধান পালন করতে। যেমন আল্লাহ পাক খাবারে অরুচি দেন, লিভার বা কিডনি যথাযতভাবে কাজ করে না, হার্টের অসুখ হয় বা রক্তে কলেস্টেরল বেড়ে যায় ইত্যাদি। ফলে তাকে হাসপাতালের বেডে না খেয়ে থাকতে হয় বা ডাক্তার খেতে নিষেধ করে। এভাবে করে আল্লাহ পাক তাদের দিয়ে রোজা রাখান এবং জরিমানাসহ রোজা রাখান। সে জন্য ইবনে সীনা এসব জটিল রোগীকে তিন সপ্তাহ রোজা রাখতে পরামর্শ দিতেন।

বিশেষ করে আমরা এ যুগে যা খাই, তাতে একটি মানুষের অবশ্যই রোজা পালন করতে হবে। রোজা পালন না করলে শরীরের বিষক্রিয়াগুলো মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়। এ যুগে আমরা যা নিত্যদিন খাই তা হল- কার্বাইড, ফরমালিন, সিনথেটিক, পোড়া তেল বা মবিল দিয়ে মচমচে ভাজা ইত্যাদি। ওইগুলো পরিশোধন করার একমাত্র ব্যবস্থা হল রোজা। রোজা না রাখলে শরীর থেকে ওই পয়োজন বা বিষক্রিয়াগুলো বের হবে না। ফলে ক্যান্সার থেকে শুরু করে নানা জটিল রোগ হতে পারে। এখন যদি কেউ রোজা পালন না করে, তা হলে তখন রোজা ঠিকই পালন করতে হবে। কিন্তু সময় গেলে, সাধন হবে না।

আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে পেয়েছেন যে, একটি রোজা মানুষের শরীরে জমে থাকে ১০ দিনের পয়োজন ধ্বংস করতে পারে। সে হিসাবে ৩০ দিন রোজা রাখলে ৩০০ দিনের পয়োজন ধ্বংস হয়। তা হলে আর ৫৫ দিনের (হিজরী বছর ৩৫৫ দিনে) পয়জন কীভাবে ধ্বংস হবে? রাসূল (সা.) শাওয়ালের আরও ছয়টি রোজাকে সুন্নত করেছেন। রাসূল (সা.) বলেছেন, রমজানসহ শাওয়ালের ৬টি রোজা যে পালন করবে সে যেন সারা বছর রোজা পালন করল। তা হলে রমজানের ৩০ ও শাওয়ালের ৬, মোট ( ৩০+৬) ৩৬টি রোজা পালন করলে এক বছরের জন্য শরীর জবভরহবফ বা জবভৎবংযসবহঃ হয়ে গেল। সে জন্যই আল্লাহ পাক রোজার বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন- ‘তোমরা রোজা পালন কর,  কল্যাণ তোমাদেরই। যদি তোমরা বুঝতে পার।’

সুতরাং আল্লাহ পাকের ঘোষণা তোমাদের ওপর রোজার বিধান লিখিতভাবে ফরজ করা হয়েছে, যেন তোমরা মোত্তাকি হতে পার। সত্যিই রোজা পালন করলে মানুষ নানা অসুখ বিসুখ ও নানা জটিল রোগবালাই থেকে বাঁচতে পারে। পরকালীন পুরস্কার তো আল্লাহ পাক দান করবেনই। আল্লাহ পাক আমাদের যেন রোজার ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ দান করেন। আমিন।

লেখক : প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 2 =