হযরত আদহাম (র)-এর আল্লাহ ভীতি

হযরত আদহাম (র)-এর আল্লাহ ভীতি

একদা হযরত আদহাম (র) নদীর কিনারে গেলেন হাজত পূরণ করার জন্য। তিনি হঠাৎ দেখলেন একটা ফল নদীর মধ্যে ভেসে আছে। তিনি ফলটা হাতে তুলে নিলেন এবং খেয়ে ফেললেন। তৎক্ষণাত চিন্তা করতে লাগলেন আসলে এটার মালিকতো আমি না। অবশ্যই কাল কিয়ামতে এই ফলের জন্য আল্লাহর কাছে আমাকে লজ্জিত হতে হবে।

তিনি মনে মনে ভাবলেন, তবে বাঁচার উপায় একটা আছে যদি ফলের মালিকের কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিতে পারি। এই ভাবনায় তিনি নদীর পার দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। এক সময় এসে এ জাতীয় ফলের বাগানও একটা পেলেন। বাগানে গিয়ে দেখলেন এক ব্যাক্তি কাজ করছেন। তার কাছে সমস্ত কথা খুলে বললেন।

তিনি এও বললেন যে, পরকালে বাঁচতে হলে অবশ্যই মাফ নিতে হবে। লোকটি সব কথা শুনে বলল আমিতো বাগানের মালিক নই, চাকর মাত্র। মালিক না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।

তিনি বসেই রইলেন।বাগানের মালিক (মহিলা) আসলে তিনি মাফ চাইলেন। এবার মহিলা বললেন, এই বাগানের মালিক আমি একা না আমি অর্ধেকের মালিক আমি আমার অংশ মাফ করে দিলাম। আর বাকি অর্ধেকের মালিক হলেন বলকের বাদশাহ হুজুর। পূর্ণ মাফ পেতে হলে তার কাছ থেকেও মাফ আনতে হবে।

হযরত আদহাম (র) কষ্ট করে বাদশাহর দরবারে হাজির হয়ে অর্ধেক ফলের মাফের আরজি পেশ করলেন।

বাদশাহ চিন্তা করলেন, অর্ধেক ফলের মাফ নেয়ার জন্য যিনি এত কষ্ট শিকার করে তিনি সাধারণ দশজনের মত মানুষ নন, অবশ্যই তিনি আলাদা। আমার একমাত্র মেয়েকে তার কাছেই বিবাহ দেব।

বাদশা বললেন, ফলের মাফ আমি দিব তবে শর্ত হলো আমার একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। তিনি আল্লাহর আদলতের ভয়ে বিয়েতে রাজি হলেন।

এদিকে বাদশাহ সব কথা জানিয়ে মেয়ের কাছে তার কথা ব্যক্ত করলেন।

মেয়ে রাজি হলো সেই ভেবে যে সপ্নে তো আমাকে তার কথাই বলা হয়েছিল। বিবাহ সম্পন্ন হলো কিন্তু স্ত্রীর বিছানায় গিয়ে বাসর না করে সারা রাত নামাজেই কাটিয়ে দিলেন। পরদিন সকালে মেয়ে মায়ের কাছে অভিযোগ পেশ করে বলল, মা! এমন এক স্বামীর কাছে আমাকে বিবাহ দিয়েছ যার হাত ধরে জান্নাতে যাওয়া যাবে। কারণ যে সারা রাত্র স্ত্রীর সাথে কথা পর্যন্ত বলে না। শুধু নামাজ পড়ে কাটিয়ে দেয় তার মধ্যমে ভালোভাবে জান্নাতের আশা করা যায়।

মা বুঝতে পারলেন তার মেয়ে স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর মর্যাদা পায়নি।

বিষয়টি নিয়ে বাদশাহর কাছে অভিযোগ করা হলে তিনি জামাইকে ডেকে বললেন, আমার মেয়ে যদি স্ত্রীর অধিকার না পায়, তাহলে কিন্তু আমি ফলের মাফ দেব না। আজ রাতেই আমার স্ত্রীর হক আদায় করতে হবে।

পরের রাতে স্ত্রীর বিছানায় গেলেন। আর এই মিলনেই পৃথিবীতে আগমণ করলেন এক বিখ্যাত ব্যক্তি। তিনি আর কেউ নন হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর বিখ্যাত সুফী সাধক হযরত ইবরাহীম বিন আদহাম। তিনি আবু আদহাম নামেও পরিচিত। তিনি হয়েছিলেন পূর্ব খোরাসানের বলখ রাজ্যের শাসক।

ইব্রাহিম বিন আদহামের কাহিনী: মাওলানা রুমী তার বিখ্যাত গ্রন্থ মসনবীতে ইব্রাহিম বিন আদহামের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। বিখ্যাত এ মনীষী আহলে বাইতের ষষ্ঠ ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)-এর বিচারবুদ্ধি ও যুক্তি ও চিন্তাধারা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তো আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য ইব্রাহিম বিন আদহাম কি ধরনের আত্মত্যাগ করেছিলেন এখন সে কাহিনীটি নিম্নে দেয়া হলো।

হযরত ইবরাহীম বিন আদহাম (রহঃ) নিজ শয়নকক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ ছাদের উপর থেকে আসা শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি শুনতে পেলেন ঘরের ছাদের উপরে কে যেন খরম পায়ে হাঁটছে। ইবরাহীম বিন আদহাম জিজ্ঞেস করলেন, এত রাতে ছাদের উপরে কে ?

ছাদ থেকে জবাব এলো, জাঁহাপনা আমি একজন উটের মালিক। হযরত ইবরাহীম আদহাম আবারো জানতে চাইলেন, তুমি উটের মালিক.. তা এত রাতে ছাদের উপরে কি করছো?
ছাদ থেকে জবাব এলো, জাঁহাপনা! আমার একটি উট হারিয়ে গেছে। কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না, তারই খোঁজে বের হয়েছি।

উটের মালিকের এ জবাব শুনে ইবরাহীম বিন আদহাম খুব রেগে গেলেন। তিনি ধমক দিয়ে বললেন, আরে নির্বোধ, ছাদের উপরে কি কখনো উট খুঁজে পাওয়া যায়? উট কি ছাদে উঠতে পারে যে, সেটি ছাদে পাওয়া যাবে ?
হযরত ইবরাহীম বিন আদহামের কথা শেষ না হতেই ছাদ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে এলো, হে ইবরাহীম আদহাম! ছাদের উপর হারানো উট যদি খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে সোনার খাট-পালঙ্কে শুয়ে থেকে কি আল্লাহকে খুঁজে পাওয়া যাবে?

ছাদ থেকে ভেসে আসা এ কথাগুলো শুনে হযরত ইবরাহীম বিন আদহাম (রহঃ) বুঝে ফেললেন, মূলত লোকটি কোন উটের মালিক নয় বরং উটের মালিকের বেশ ধরে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফেরেশতা। তাঁকে মহান আল্লাহ আরো বেশী আপন করার জন্য পথপ্রদর্শনের জন্য পাঠিয়েছেন।

বাদশাহ ইবরাহিম আদহাম ভাবলেন, আজ আমাকে যে কথা শোনানো হলো তাতো ঠিকই। কারণ মহান আল্লাহকে পেতে হলে কঠোর সাধনা ও আত্মত্যাগের প্রয়োজন। কিন্তু আমি তো এখনো বাদশাহী আয়েশী জীবন পরিত্যাগ করতে পারিনি। রাজকীয় সুখ-সম্ভোগে লিপ্ত থেকে কি আর আল্লাহপাকের প্রিয়ভাজন হওয়া যায়?

এসব চিন্তা-ভাবনা করার পর তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে বসলেন। তাঁর সমস্ত শরীরে এক নব বিপ্লবের স্পন্দন অনুভব করলেন। নিমিষেই সমস্ত শরীর ঘেমে গেলো। তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর চিরদিনের জন্য তিনি রাজসিংহাসনের মায়া ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লেন পরম করুণাময় আল্লাহপাকের সন্ধানে।

লেখক, মাওলানা জালাল উদ্দিন উসমানী, খতিব, উত্তর কাঠগড়া বায়তুল মামুর জামে মসজিদ,আশুলিয়া,ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − one =