হজ যখন কবুল হয়

হজ যখন কবুল হয়

হজ কবুল হওয়া আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার ইচ্ছাধীন। হাজীরা নিজেদের পরিবর্তনের মাঝে তা টের পান। এবাদতের স্পৃহা তখন বেড়ে যায়। পরমাত্মার নাম শ্রবণে তিনি আকুল হয়ে ওঠেন। প্রেমময়ের প্রেমের আলোয় তিনি আলোকিত হন। ঐশী আলোর দিকে বান্দা অগ্রসর হতে থাকেন।

আত্মা ছাড়া যেমন দেহ বেকার, তেমনই হজ কর্ম সম্পাদনের জন্য আত্মার সংযোগ একান্ত প্রয়োজন। কথাটি একটু বেখাপ্পা মনে হলেও অতি সত্য। হজের প্রতিটা আহকামে রয়েছে আত্মার সংযোগ। নিয়মাবলীগুলো মানার সময় যদি আমরা কেন করছি তা জানা থাকে তবেই হজের সময় হৃদয়ের আবেগ সৃষ্টি হবে এবং হজ পরিশুদ্ধতা পাবে নয়তো পণ্ডশ্রম।

হজের বাহ্যিক নিয়মকানুনগুলোও অনেকে জানতে নারাজ। প্রতিটা হজযাত্রী বিনামূল্যে হজ গাইড বই পেয়ে থাকেন। এমনকি বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে সুষ্ঠুভাবে হজ পালনের নিয়মাবলী জানানোর ব্যবস্থা থাকে। এরপরও বেশিরভাগ হজযাত্রী এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে চান না। ফলস্বরূপ বায়তুল্লাহে গিয়ে নানারকম হজবহির্ভূত অশোভনীয় ক্রিয়া কলাপ করতে দেখা যায় তাদের। পরিশুদ্ধভাবে হজক্রিয়া সম্পাদন করতে হলে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি জানা থাকলে হজে মাবরুর আদায় হবে। যা মাহবুবের দরবারে কবুল হবে। জীবনে পরিবর্তন আসবে। এবাদতের আলোকে হৃদয় আলোকিত হয়ে যাবে। যার রেশ মৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
এহরামের পবিত্র পোশাকটি কাফনের কাপড় সদৃশ। এটি পরার সঙ্গে সঙ্গে মৃতের মতো ভাবতে হবে। দুনিয়ার সব ভালোবাসার সম্পর্কের ইতি টানতে হবে। মৃত্যুর পর যেমন আমরা আল্লাহ পাক সমীপে যাত্রা করি সেভাবে সেই পোশাকে আল্লাহতায়ালার পবিত্র গৃহে পরকালীন কর্মের একটা মহড়া দিতে যাচ্ছি। বড় কাজের জন্য পরিশ্রমকে বড় করে দেখা যাবে না। পথে সবরের কঠিন পরীক্ষা দিতে কুণ্ঠিত না হওয়া। দুনিয়ার মোহপাশ থেকে মুক্ত হয়ে হজের সফর করলে তাতে পরকালের সফর হজ হওয়ার আশা করা যায়। পথের সফরে তাকওয়া ও খোদাভীতিকে সঙ্গী করে নিতে হবে। আমলের ওপর ভরসা না করে তার দয়ার প্রত্যাশা করতে হবে। লাব্বাইক বলার সময় মনে আনতে হবে কেয়ামতে সিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হয়েছে আর কবরবাসীরা একে একে কেয়ামতের মাঠে হাজিরা দিচ্ছে। সেখানে কেউ আপ্যায়িত হবে আর কেউ হবে নিগৃহীত। তবে মনের মধ্যে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের রহমতের আশা জাগিয়ে রাখতে হবে।

পবিত্র হেরম শরিফে খুব আদবের সঙ্গে প্রবেশের পর কাবা শরিফকে দেখে মওলার কাছে প্রার্থনা করতে হবে যে, তিনি যেমন তাঁর পবিত্র গৃহ দেখার তওফিক দান করেছেন, তেমনই তাঁকে দেখার নসিব যেন নিজ দয়ায় দান করেন। মাকামে ইবরাহিম আল্লাহ পাকের একটি নিদর্শন।

পাথরের বুকে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কদম মোবারকের ছাপ দেখে আল্লাহ পাকের কুদরতের হাজার শোকর আদায় করতে হবে। হজরে আসওয়াদকে দূর থেকে বা কাছ থেকে চুম্বন করার সময় মনের মধ্যে সৎ কর্ম করার সংকল্প আনতে হবে। এটি বেহেশতি পাথর। তবে শক্ত নয় কিছুটা তুলতুলে। এটির ব্যাপারে আল্লাহওয়ালারা মুখ খুলতে নারাজ। গৃহ ও গৃহের প্রভুর ভালোবাসা পাওয়ার আশা পবিত্র কাবা ও মুলতাজামকে ধরার সময় ভাবতে হবে। অপরাধীর মতো করে আল্লাহ পাকের কাছে মাগফিরাত কামনা করতে হবে। নিজের গুনাহের ব্যাপারে তাওয়াফের সময় প্রেমময় প্রভুর গৃহের চতুর্দিকে ঘুর ঘুর করছি তাঁর রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের আশায়। হাতিম পবিত্র কাবার অংশ।

কাবা পুনঃসংস্কারের সময় অর্থাভাবে এ অংশটি বাইরে থেকে যায়। এটিও মহান রাব্বুল আলামিনের বিশেষ কৃপা, কারণ এখানে নামাজ পড়নেওয়ালা কাবার ভেতরে নামাজ পড়ার সওয়াব অর্জন করেন। তাই সেজদায় লুটিয়ে শোকর আদায় করা দরকার।
সন্তানের জন্য পানির সন্ধানে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর মাতা হজরত হাজেরা (আ.) সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। এবং প্রার্থনা করেছিলেন। (এই ঘটনার স্মৃতিরক্ষার্থে হাজীদের সাফা ও মারওয়ার সাতবার সায়ী করতে হয়)। অবশেষে শিশুর পদাঘাতে ঠাণ্ডা সুমিষ্ট পানি বের হয়েছিল। যা সর্বরোগের সেফা হিসেবে কাজ করে। এ জমজম পানি শুধু তৃষ্ণাই মেটায় না এটি খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। সায়ী করার সময় আল্লাহ পাকের দয়ার কথা ভাবতে হবে, যেমন করে তিনি অসহায় মাতার আকুতি পূর্ণ করেছিলেন, তেমনি করে নিজেদের চাহিদার ব্যাপারে আকুলি-বিকুলি হয়ে চাইতে হবে। আর মনে করতে হবে কেয়ামতের মাঠে দাড়িপাল্লার উভয়দিকে (একদিকে নেকি আর অপরদিকে বদি) এমনিভাবে দৌড়াচ্ছি- কোনটি বেশি আর কোনটি কমে যাচ্ছে।

আরাফাতের মাঠ কেয়ামতের মাঠের মতোই। ওই দিন হাজীদের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায়। চারদিকে লাব্বাইক ধ্বনি, উচ্চ আওয়াজ, অস্থিরতা এবং বিশ্বের প্রতিটি হাজী যার যার মোয়াল্লেমের অধীনে জামাতবদ্ধ হয়ে থাকবে।

পাথর মারার সময় মনের মধ্যে বসে থাকা কুপ্রবৃত্তির উদ্দেশে যেন হয়। পশু কোরবানি তো একটা প্রতীক। প্রকৃত পক্ষে যেসব কাজ আমাদের আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সেসব কাজ ত্যাগ করাই কোরবানির মাহাত্ম্য।

সোনার মদিনায় যাওয়ার আগেই হৃদয়কে স্থির করে নিতে হবে। যে পবিত্র ভূমিতে আমাদের প্রাণ প্রিয় রাসূল (সা.) শুয়ে আছেন, সঙ্গে তাঁর প্রিয়জনেরা। এ পবিত্র ভূমিতেই তিনি ফরজ ও সুন্নত জারি করেছেন। ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জেহাদ করেছেন। ইসলাম প্রচার করে গেছেন বীর দর্পে। তাঁর রওজা পাকে খুব আদবের সঙ্গে সালাম ও দরূদ পাঠ করে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতে হবে। তাঁর মহান মর্তবার কথা ভাবতে হবে। কল্পনায় তাঁর হাজেরী অনুভব করতে হবে।

হাদিস অনুযায়ী যে ব্যক্তি মদিনা জিয়ারত সম্পন্ন করল, সে যেন জীবদ্দশাই আমার জিয়ারত করল [মিশকাত] তাই তাঁর খেদমতে হাজির হয়ে এমন আদবের সঙ্গে চাপা আওয়াজে হৃদয়ের সব সুধা ঢেলে দরদ ও সালাম আরজ করা দরকার যেন তিনি দয়া করে শুনছেন। কেয়ামতের দিনে তাঁর কাছে তারই দলে আর তাঁরই পতাকাতলে থাকার জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে মিনতি জানাতে হবে। আর মরণ চাইতে হবে তাঁর মহব্বত ও তাঁর তরিকার ওপর, কারণ তাঁর সাফায়াত ছাড়া কারও মুক্তি নেই।

হজ কবুল হওয়া আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার ইচ্ছাধীন। হাজীরা নিজেদের পরিবর্তনের মাঝে তা টের পান। এবাদতের স্পৃহা তখন বেড়ে যায়। পরমাত্মার নাম শ্রবণে তিনি আকুল হয়ে ওঠেন। প্রেমময়ের প্রেমের আলোয় তিনি আলোকিত হন। ঐশী আলোর দিকে বান্দা অগ্রসর হতে থাকেন। এটিকে জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্ত ধরে রাখার চেষ্টায় সাধনা করে যেতে হবে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 1 =