বিয়ের বয়স কবে হবে?

বিয়ের বয়স কবে হবে?

বিয়ে। দু’টি মানুষের কাছে আসা, দু’টি প্রাণের আপন হওয়ার এক বরকতময় সূচনা। বিয়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানব জাতিকে এক পবিত্র ও সুন্দর জীবন যাপনের সোনালী সোপান উপহার দিয়েছেন।

মানবজাতির সভ্য ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য, মানব সভ্যতার আগামী প্রজন্ম নিশ্চিত, নিরাপদ, প্রেমময় ও পবিত্র পরিবেশে বেড়ে ওঠার জন্য বিবাহের বিকল্প নেই।

কিন্তু দু:খজনক হলেও কঠিন সত্য বিষয় হচ্ছে আজ সারা বিশ্বজুড়েই সাম্রাজ্যবাদী অসভ্য, বর্বর অপশক্তি ও তাদের দোসরদের সর্বাত্মক অপপ্রচার, প্রপাগান্ডা এবং এদেশীয় কিছু কুচক্রী মহলের যৌথ উদ্যোগে আজ আমাদের জীবন ও সমাজ থেকে বিয়ের মতো মহান পবিত্র একটি বিষয় খুবই গৌন, সীমিত ও দূরহ করে দেয়ার মহা ভয়ংকর চক্রান্তের কূটিল বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করছি।

আমাদের আজকের সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে বিবাহকে খুবই কঠিন করে ফেলা হয়েছে। মানুষ যেনো বিবাহের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে সেজন্য সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারী ও বেসরকারী উভয় ক্ষেত্র থেকেই একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী ও পুরুষের বিবাহের দিকে অগ্রসর হওয়াকে খুবই কঠিন করে ফেলা হয়েছে।

আজকের সমাজের বাস্তবতায় একজন নারী সাবালক হলেই হবে না, এরপর তাকে আরো অনেক গুলো বছর অপেক্ষা করতে হবে বিবাহের জন্য। ‘কুড়িতে বুড়ি নয়, ১৮ বছরের আগে বিয়ে নয়’ ইসলাম বিদ্বেষী এনজিওদের এমন নানান উদ্যোগ সর্বত্রই বিরাজমান। তাদেরকে এই ক্ষেত্রে সহায়তার জন্য রয়েছে প্রশাসন। কিন্তু একজন কন্যা শিশুর বালেগ হওয়ার পথ থেকে নিয়ে ১৮ বা ২০ বছর পর্যন্ত সময়টির নিরাপত্তা, প্রয়োজন ও অন্যান্য বাস্তবিক বিষয় গুলোর কোনো ব্যবস্থা এই সমাজ করতে পারে নি।

অপরদিকে প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের জন্যও এই সমাজে চালু হয়েছে এক অলংঘনীয় কঠিন বিধান। আর তা হচ্ছে ‘প্রতিষ্ঠিত’ না হয়ে বিয়ে করা যাবে না। এই প্রতিষ্ঠিত হতে হতে একজন যুবকের দশা একেবারে কাহিল করে ফেলা হয়। ৩০-৪০ বছরেও অনেকে ‘প্রতিষ্ঠিত’ হতে পারে না। এরপর যখন সে ‘প্রতিষ্ঠিত’ হয় তখন দেখা যায় যে তার আর বিয়ে করারই আগ্রহ থাকে না।
এছাড়াও বিয়েতে ফালতু খরচের আধিক্য এনে বিষয়টিকে এমন ভয়ংকর করা হয়েছে যে এক্ষেত্রে সাহসী হয়ে কিছু করারও সুযোগ থাকেনা বিয়ে করা আবশ্য যুবকদের জন্যও। কিন্তু প্রেম করা, গার্লফ্রেন্ড নিয়ে সময় কাটানো ও নানাবিধ গুনাহে লিপ্ত হওয়ার মহাসড়ক উন্মুক্ত করে দিয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্র। এমনকি জাহেলী চিন্তা আমাদের অভিভাবকদেরকেও এতোটাই আচ্ছন্ন করে ফেলেছে যে তারাও নিজ নিজ সন্তানদের এমন পাপাচারকে সহজভাবে গ্রহণ করে নিলেও হালাল ও আবশ্যক বরকতময় বিবাহকে মেনে নিতে পারেন না।

অথচ এসকল বিষয় সম্পূর্ণ কুরআন ও সুন্নাহ পরিপন্থী। ইসলাম বালেগ হওয়ার পর ছেলে-মেয়েদের বিবাহ দেয়ার ব্যাপারে অভিভাবকদেরকে নির্দেশ দিয়েছে। বিবাহের মাধ্যমে দুটি পরিবারের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নারী পুরুষের ইজ্জত-সম্ভ্রম হিফাজত হয়। পারিবারিক শান্তি ও সুন্দর জীবন লাভ করা যায়। এছাড়াও বিবাহের মাধ্যমে সামাজিক পর্যায়ে অনেক সুফল পাওয়া যায়। এজন্যই মহানবী সা. স্ত্রীর নূন্যতম ভরণ-পোষণ দিতে সক্ষম সকল যুবককে বিবাহের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে:
عن عبد الله بن مسعود قال لنا رسول الله صلى الله عليه و سلم ( يا معشر الشباب من استطاع الباءة فليتزوج فإنه أغض للبصر وأحصن للفرج ومن لم يستطع فعليه بالصوم فإنه له وجاء )
অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী সা. বলেছেন, হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রীদের ভরণ-পোষণের সক্ষমতা রাখে তারা যেন বিয়ে করে ফেলে। কেনন এটা চোখের প্রশান্তি দানকারী ও লজ্জাস্থানের হিফাজতকারী। আর যারা স্ত্রীদের ভরণ-পোষণের সামর্থ্য রাখে না, তারা যেন রোজা রাখে, কেননা এটা তাদের উত্তেজনাকে হ্রাস করবে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৭৭৮)

বিবাহের ফজিলত:
وعن أنس قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ” إذا تزوج العبد فقد استكمل نصف الدين فليتق الله في النصف الباقي ”
অর্থ: “হযরত আনাস রা. থেকেব বর্ণিত, যখন কোন ব্যক্তি বিবাহ করে, তখন সে যেন তার অর্ধেক ঈমানকে পূর্ণ করে ফেললো। এখন বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।” (মিশকাত শরীফ: হাদীস নং ৩০৯৭)
বিবাহের মাধ্যমে মানুষ তাদের প্রাকৃতিক চাহিদা বৈধ পন্থায় পুরণ করে। পারিবারিক জীবনে প্রশান্তি লাভ করে। ইরশাদ হয়েছে:
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا
অর্থ: তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকে বানিয়েছেন তার সঙ্গিনীকে, যাতে সে তার নিকট প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আরাফ, আয়াত ১৮৯)

অনেক ভাইকে দেখি বয়স হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বিয়ে করার কথা বলতে পারছে না। তাদের অভিভাবকরাও যেনো দেখেও না দেখার ভান করছে। তাদের কাছে তাদের সন্তান যেনো এখনও সেই ‘ছোট্ট বাবুটি’ই রয়ে গেছে। কেউ বা বিবাহের প্রশ্ন আসলেই বলে ফেলে- বিয়ে করে বউকে খাওয়াবে কী?
আরে কুঞ্জুস! বাঙালি জাতির জাতীয় খাবার হচ্ছে ভাত-মাছ-সব্জি। বিয়ের পর বউকে ভাত-মাছ-সব্জি খাওয়াবে! এতে আশ্চর্যের কি আছে!

আবার অনেক যুবক নিজেরাও এ বিষয়টিতে সংকোচ করে পিছিয়ে থাকেন। বিয়ের কথা উঠলে দারিদ্রতার কথা বলেন। অথচ মাসে মাসে মোবাইল ও ইন্টারনেটের পেছনে তারা হাজার হাজার টাকা খরচ করতে পারেন কিন্তু সামান্য একজন প্রিয় মানুষের আহার যোগাবার খরচ নেই বলে মিথ্যার আশ্রয় নেন!

এই সকল ভাইদের জেনে রাখা দরকার, আপনাদের লক্ষ্য করেই রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন-
النكاح سنتي فمن رغب عن سنتي فليس مني }. ابن ماجه
অর্থ: ‍”বিবাহ করা হচ্ছে আমার সুন্নাত। যে আমার এই সুন্নাত পালন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো, অপছন্দ করলো সে আমার উম্মাতের অন্তরভুক্ত নয়”। (ইবনে মাযা।)

মহান আল্লাহ আমাদের সকল প্রাপ্ত বয়স্ক দীনী ভাই-বোনদের বিবাহের বিষয়টি সহজ করে দিন। আমীন।

লেখক: মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক খান,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 + 15 =