ধর্ষণরোধে মনোবিজ্ঞানী ও আইনজ্ঞদের ভাবনা

ধর্ষণরোধে মনোবিজ্ঞানী ও আইনজ্ঞদের ভাবনা

মূল্যবোধের অবক্ষয়, রক্ষণশীলতার ঘাটতি, পর্নোগ্রাফি এবং কিছু পুরুষের মানসিক বিকৃতির কারণে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। শিক্ষা ও চাকরিসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। আগের তুলনায় নারীরা তুলনামূলক বেশি প্রকাশ্যে।

একই সঙ্গে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে বিরাজ করছে নিরাপত্তাহীনতা। মানসিক রোগাক্রান্ত কিছু পুরুষ এ পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে নারী ও শিশু। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া, পুলিশে ধরলেও জামিন পাওয়া এবং ধর্ষকদের উপযুক্ত চিকিৎসা না হওয়ায় ধর্ষণের ঘটনায় নিরুৎসাহিত না হয়ে অনেকে উৎসাহিত হচ্ছে।

এমন প্রতিক্রিয়া দেশের বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, আইনবিদ, অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীদের।

তারা ধর্ষণের ঘটনার লাগাম টেনে ধরতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, গণমাধ্যমে প্রকৃত সত্য তুলে আনতে হবে। এর নিরিখে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বাবা-মা, জনপ্রতিনিধি, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ সর্বোপরি সরকারকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। নারী ও কন্যাশিশুর জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে না পারলে দেশের অগ্রগতি থেমে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক দিন ধরে দেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, জুলাইয়েই র্ধষণ ও যৌন নিপীড়নের সংখ্যা ১৬৮টি। এর মধ্যে ধর্ষণ ৯৭টি, গণধর্ষণ ১৫, ধর্ষণের পর হত্যা ১১, ধর্ষণচেষ্টা ২৮, শ্লীলতাহানি ১২ এবং যৌন নিপীড়ন ৫টি।

এছাড়া বিয়ের প্রলোভনে যৌনকর্মের পর সন্তানের স্বীকৃতি না দেয়ার ঘটনা ৩টি। পতিতালয়ে বিক্রি একটি, জোরপূর্বক বিয়ে ৫টি এবং নারী উত্ত্যক্ত করার ঘটনা ঘটেছে ২২টি।

বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. একেএম নূর-উন-নবী এ প্রসঙ্গে বলেন, নারীরা যে নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন, মহিলা পরিষদের তথ্যই এর প্রমাণ। আমি যতটা জানি, তারা পত্রিকায় প্রকাশিত ঘটনাগুলো থেকে তথ্য তৈরি করে।

তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যই যদি এত হয়, তাহলে কত ঘটনা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, নারী আগের চেয়ে অনেক বেশি এক্সপোসড (প্রকাশিত)। লেখাপড়ায়, চাকরি, গার্মেন্টসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর সপ্রতিভ উপস্থিতি। এর সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণীর লোক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। নইলে সাড়ে ৩ বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা নয়।

তিনি বলেন, তবে বর্তমানে এ সংক্রান্ত রিপোর্টিংও বেড়েছে। গণমাধ্যমের তীক্ষè নজরদারি সর্বত্র। মা-বাবারাও আগের চেয়ে অনেক সোচ্চার। আগে এ ধরনের ঘটনা চেপে রাখা হতো মেয়ের বিয়ের কথা মাথায় রেখে। বিচার চায় ভিকটিমের পরিবার।

অধ্যাপক নবী বলেন, কোনো দেশ উন্নয়নের দিকে গেলে সুফলের পাশাপাশি কিছু ঝুঁকিও দেখা দেয়। তিনি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সবাইকে সোচ্চার ও তৎপর হওয়ার পরামর্শ দেন।

মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম ৩ মাসে ৭৭৬ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ৫১৪টি। গণধর্ষণের শিকার ৯৭ জন। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে প্রায় ৬টির বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২১ জনকে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার আরও ৭০ জন।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্য বলছে, চলতি বছর ৩ মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৯ শিশু। ধর্ষণের চেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার আরও ৬২ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ শিশুকে।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির তথ্য বলছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪ বছরে ৩ হাজার ৩০০ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। পুলিশ সদর দফতর বলছে, চলতি বছর প্রথম ৪ মাসে রাজধানীসহ সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১০ হাজার ৩২৪টি।

আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব হচ্ছে, জানুয়ারি থেকে জুন ২০১৭ পর্যন্ত ২৮০ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এছাড়া সংস্থাটির তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে জুন ২০১৭ পর্যন্ত একই সময়ে ২৪৫ জন শিশুকে হত্যা করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ও সাবেক ডিন ড. তাসলিমা মনসুর বলেন, উপরের পরিসংখ্যানগুলো থেকে স্পষ্ট, নারী ও শিশু নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। জনগণ আশা করে ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নেবে সরকার। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে, যাতে এই ধরনের ঘৃণ্য নির্যাতন ও অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

তিনি বলেন, ধর্ষণের ঘটনা হ্রাসে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। জাতীয় অগ্রগতির জন্য নারীকে আমরা ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসছি। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছি না। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবশ্রেণীর মধ্যে ধর্ষক ও নারী নিপীড়ন আছে। এদেরকে প্রতিরোধের দায়িত্ব প্রথমত রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। পুলিশকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। বিচারটা যাতে সুষ্ঠু, দ্রুত, দৃষ্টান্তমূলক হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে।

 

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সালাউদ্দিন কাওসার বিপ্লব বলেন, যে যৌনাচার জোরপূর্বক করা হয় সেটাকে বলে ধর্ষণ। এটা অনেকটা অপরাধীর সুযোগ প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে।

 

এর মানে, আগের চেয়ে সুযোগ বেশি পাচ্ছে অপরাধীরা। এর কারণের মধ্যে আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ফেসবুক, ইন্টারনেট, যৌনাচার নিয়ে অবাধ আলোচনা, খুব সহজে এ ধরনের আচরণ মেনে নেয়ার প্রবণতা।

 

ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির কারণে মানুষ অনেক বেশি ‘স্টিমুলেটেড’ (উত্তেজিত) থাকে। সমাজ আগে অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিল। হঠাৎ করে একটি শ্রেণী তৈরি হয়ে গেছে, যারা উৎসাহী হয়ে গেছে। তারা পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় কোনো রক্ষণশীলতা মানতে রাজি নন।

 

একদিকে যৌন আচরণের বিষয়গুলো বেশি দেখা এবং এর থেকে স্টিমুলেশন (উত্তেজনা) অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি করে। ছেলেমেয়েরা বিশেষ করে মেয়েদের ‘এক্সপোজেশন’ (প্রকাশ) বেড়ে যাওয়ায় অপরাধীরা এটাকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে।

 

তিনি বলেন, বিজ্ঞানের কথা হচ্ছে- যে কোনো আনঅথেনটিক (অসমর্থিত) কাজ বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে সহজলভ্যতা। নেশা বেশি গ্রহণ করে যখন নেশাজাতীয় দ্রব্য বেশি পাওয়া যায়। সভ্যতা তৈরি হয়েছে এসব অপরাধ থেকে মানুষকে সুরক্ষার জন্য।

 

তিনি বলেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে কয়েকটি কাজ করা যায়। তার মধ্যে স্কুলে-পরিবারে, সমাজে মৌলিক মূল্যবোধ চর্চা ও পারিবারিক প্রথা-রক্ষণশীলতা বাড়াতে হবে। সবক্ষেত্রে নারী ও কন্যা শিশুর নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। ইন্টারনেটে যেসব সাইট মানুষকে বিপথে নেয়, তা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। সচেতনতা, শিক্ষা ইত্যাদি বাড়াতে হবে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বলেন, কোনো মানুষ একসঙ্গে বড় অপরাধ করে না। যে ব্যক্তিটি একটি শিশু বা নারীকে ধর্ষণ করে, তার আগে সে ছোটখাটো অনেক ঘটনা ঘটনায়। ছোট ঘটনা ঘটানোর পরই তাদের ধরা উচিত। জেলে পাঠানো উচিত। কেননা এ ধরনের লোকগুলো প্রফেশনাল অ্যান্ড পটেনশিয়াল ক্রিমিনাল (পেশাদার ও কার্যকর বা গুপ্ত অপরাধী)।

 

তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় মামলা হলে তাদের ধরার পর জামিন দেয়া উচিত নয়। সাজা খাটার পর জেল থেকে ছাড়ার আগে মনোবিজ্ঞানী দিয়ে এ ধরনের অপরাধীর ব্যাপারে আলোচনা করা উচিত যে, সে সংশোধন হয়েছে কিনা? প্রয়োজনে কারা কর্তৃপক্ষের অধীনে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করা উচিত।

 

তিনি বলেন, সভ্যতার অগ্রগতি এবং উন্নয়নের সঙ্গে সমাজে নারী-পুরুষ সমান হারে অবদান রাখছে রাষ্ট্রে। শিক্ষা এবং কর্মজগতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েই চলেছে। তাই নারীকে সুরক্ষার জন্য প্রথমত অভিভাবককে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে সুরক্ষার দিকগুলো জানাতে, শেখাতে ও বোঝাতে হবে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আজিজুর রহমান বলেন, ধর্ষণ একটি রোগ। এটি মানসিক বিকৃতিও। নানা কারণে মানুষের মধ্যে এ রোগটি বেড়ে চলেছে। ধর্ষণ বন্ধে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণমাধ্যমে প্রকৃত সত্য তুলে আনতে হবে। এর নিরিখে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বাবা-মা, জনপ্রতিনিধি, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, বিচার বিভাগ সর্বোপরি সরকারকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে।

 

মানবাধিকার কমিশনের উদ্বেগ : সম্প্রতি ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যথাসময়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় দুর্বৃত্তরা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। সামাজিক অস্থিরতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এ ধরনের ঘৃণ্য ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কমিশন মনে করে, এ ধরনের ঘটনার পুনরবৃত্তি রোধে ঘটনাগুলো দ্রুত আমলে নিয়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − seventeen =