আহমাদ দিদাত ও মরিয়ম জামিলার গল্প

আহমাদ দিদাত ও মরিয়ম জামিলার গল্প

ইসরাইলের স্কুল পর্যায়েই তুলনামূলক ধর্মতত্ব পড়ানো হয়। শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় যে, ইহুদি ধর্মগ্রন্থ থেকেই খ্রিষ্টানদের বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্ট ও ইসলামের কুরআন নকল করা হয়েছে (আল্লাহ মাফ করুন)….ইহুদিরা বিষয়টির ওপর অসংখ্য গ্রন্থও রচনা করেছে এবং করছে। অন্যদিকে, খ্রিষ্টান পন্ডিতদের মধ্যে অনেকে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছে এবং করছে ইসলাম, হযরত মুহাম্মাদ (দ) ও কুরআনের বিরুদ্ধে।

আহমাদ দিদাত একবার একটা হিসেব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইসলামের বিরুদ্ধে ৬০ হাজারের বেশী গ্রন্থ রচিত হয়েছে।

এখন তো ইন্টারনেটের যুগ! ইন্টারনেটে ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য ডিজিটাল গ্রন্থ ও আর্টিকেল। দুঃখের বিষয় ইসলামের পন্ডিত ব্যক্তিদের খুব কমই এসব অভিযোগের এবং কখনও কখনও মিথ্যাচারের যুক্তিযুক্ত জবাব সম্বলিত গ্রন্থ লিখেছেন।

আধুনিককালে দক্ষিণ আফ্রিকার আহমাদ দিদাত এ কাজটি শুরু করেছিলেন। তিনি প্রথমে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেন এবং আত্মস্থ করেন। তাকে বলা হয় বাইবেলের হাফেজ। তিনি বাইবেলের বহু সংস্করণ আত্বস্থ করেছিলেন। তিনি কুরআন-হাদিসের ওপরও প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। তারপর তিনি খ্রিষ্টান পন্ডিতদের বিতর্কে আহ্বান জানান। এ বিতর্ক মারামারির বিতর্ক ছিল না। তিনি তাদের বললেন, আসো, আমি তোমাদের ধর্মীয় গ্রন্থ দিয়েই প্রমাণ করবো যে, হযরত মুহাম্মাদ (দ)-এর আগমন সম্পর্কে জিজাস ক্রাইস্ট (হযরত ঈসা), মোজেস (হযরত মুসা) ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। এখন তোমরা যদি তাদের অনুসারী হও, তবে তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে হযরত মুহাম্মাদ (দ)-কে অনুসরণ করা।

আহমাদ দিদাত তার জীবনে অসংখ্য বিতর্ক করেছেন। তার সেসব বিতর্ক শুনে অনেক ইহুদি ও খ্রিষ্টান ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আবার তার বিরুদ্ধেও নানান ষড়যন্ত্র হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় তাকে অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হয়নি।

জাকির নায়েক হচ্ছেন আহমাদ দিদাতে ভাবশিষ্য। দিদাত মারা গেছেন। তার শুরু করে যাওয়া কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ভারতে বসে তিনি অসংখ্য লেকচার দিয়েছেন, বহু হিন্দু পন্ডিতের সঙ্গে বিতর্ক করেছেন। সর্বশেষ দেখেছিলাম শ্রী শ্রী রবিশঙ্করের সঙ্গে তার বিতর্ক। সে অনুষ্ঠানে দুই পন্ডিত যুক্তি দিয়ে নিজেদের বক্তব্য প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। বিতর্কের বিষয় ছিল, ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের মিল। জাকির নায়েক বেদ থেকে ঊদ্ধৃতি দিয়েছেন, প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, খোদ বেদে হযরত মুহাম্মাদ (দ)-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, খোদ বেদ অনুসারে ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, যেমনি ইসলামে বলা হয়েছে। বিতর্কশেষে দুই পন্ডিত উপহার বিনিময় করেছেন। হাসিমুখে পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন।

যারা জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদকে উস্কে দেওয়ার অভিযোগ করছেন, তারা আসলে না-বুঝেই বা বদ মতলবে সেটা করছেন, এ ব্যাপারে আমার মনে কোনো সন্দেহ নাই। আর এটাই স্বাভাবিক। জাকির নায়েক ইসলাম প্রচার করছেন, বিদাতমুক্ত ইসলাম। তিনি তুলনামূলক ধর্মতত্বের পন্ডিত হিসেবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করছেন, এতে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করছেন। এটা অনেকের মর্মবেদনার কারণ হবে, এটা অস্বাভাবিক নয়। তাই, প্রথম সুযোগে পিস টিভি বন্ধ করা হলো, তাকে নিষিদ্ধ করা হলো। ভারতে তার বিরুদ্ধে মামলা হলো, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলো।

আমি জাকির নায়েকের অনুসারী নই। আমি হযরত মুহাম্মাদ (দ)-এর অনুসারী। আমি কুরআনের অনুসারী। আমার নবী (দ) এবং তার কাছে নাযিল হওয়া কুরআন আমাকে জঙ্গি হতে শেখায়নি। আর এর জন্য খানিকটা কৃতিত্ব জাকির নায়েকের। কারণ, ইসলাম যে শান্তির জীবনবিধান, এখানে যে অন্য ধর্মের মানুষ নিরাপদ, এই ধর্মের অনুসারীদের জন্য নিরপরাদ মানুষ হত্যা গোটা মানবজাতিকে হত্যার সমান অপরাধ—এগুলো আমি তার মতো পন্ডিতদের কাছেই শিখেছি। আমি আহমাদ দিদাত ও জাকির নায়েকের জন্য অন্তর থেকে দোয়া করি এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবো। আমি মনে করি না, পিস টিভি নিষিদ্ধ করে বা জাকির নায়েককে নিষিদ্ধ করে খুব বেশি সুবিধা করা যাবে। কারণ, আহমাদ দিদাত যখন মারা গেলেন তখন আমি এই ভেবে কষ্ট পেয়েছিলাম যে, হায় আরেকজন আহমাদ দিদাত কোথায় পাবো?!

আল্লাহপাক তার চেয়েও বড় একজন পন্ডিতকে উপহার দিলেন। জাকির নায়েক নিষিদ্ধ হলেও, অংসখ্য নায়েক তৈরি হবে, তারা তুলনামূলক ধর্মতত্ব নিয়ে আলোচনা করে যাবেন এবং ইসলামের খাঁটিত্ব দুনিয়ার সামনে তুলে ধরা অব্যাহত রাখবেন, আমি এটা বিশ্বাস করি। আর আমি বিশ্বাস করি না যে, পিস টিভি বন্ধ করে বা জাকির নায়েককে নিষিদ্ধ করে ইসলামের কোনো ক্ষতি করা যাবে।

একটা সত্য কাহিনী বলে শেষ করি। শুরুতেই বলেছিলাম, ইসরাইলের কথা। তো, সেখানকার একটি স্কুলে তুলনামূলক ধর্মতত্বের ছাত্রী মার্গারেট মারকিউরিস। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক একজন টিনএজার। মন দিয়ে ধর্মতত্বের ক্লাশগুলো করেন। শিক্ষক তাদের বলেন, বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট ও কুরাআন তাওরাত থেকে নকল করা হয়েছে। শিক্ষক এটা প্রমাণ করতে বাইবেল, তাওরাত (ওল্ড টেস্টামেন্ট), ও কুরআন থেকে ঊদ্ধৃতি দেন। তো, মার্গারেটের আগ্রহ বেশি। সে বাইবেল, তাওরাত, আর কুরআন পড়া শুরু করলো। মানে শিক্ষকের ঊদ্ধৃতির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখলো না। পড়তে পড়তে তার মনে হতে লাগলো: কুরআন বাইবেল বা তাওরাতের নকল নয়, বরং কুরআনের ভাষ্য অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য।

একসময় মার্গারেট এ সিদ্ধান্তে আসলেন যে, তিনটি গ্রন্থই স্রষ্টার কাছ থেকে এসেছে, তবে কুরআন অবিকৃত আছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে তার শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ করলেন। শিক্ষক তাকে নানান যুক্তি দিলেন তাওরাতের পক্ষে। তার মনোঃপুত হলো না। তিনি ইসলাম সম্পর্কে জানতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পন্ডিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। তার নতুন নাম হলো মরিয়ম জামিলা।

লেখক: আলিমুল হক, সাবেক নিউজ এডিটর, চ্যানেল ওয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − twelve =