পাঠ্যপুস্তকের শব্দ ও সাহিত্য নিয়ে আবুল মনসুরের আক্ষেপ

পাঠ্যপুস্তকের শব্দ ও সাহিত্য নিয়ে আবুল মনসুরের আক্ষেপ

সম্প্রতিকালে শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে মুসলিম লেখকদের লেখা গল্প ও সাহিত্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শব্দ নিয়েও দেখা দিয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ এটাকে সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়াস পেয়েছেন।

অথচ ঐতিহাসিকভাবে আমরা দেখি প্রতিক্রিয়াটাই এক ধরণের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।

ওই গোষ্ঠীর প্রবল সমালোচনার কারণে শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘বন্দনা’, আলাওলের ‘হামদ’, আবদুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’, গোলাম মোস্তফার ‘জীবন বিনিময়’ ও কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর ফারুক’ কবিতাটি বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

এর পরিবর্তে জ্ঞানদাসের ‘সুখের লাগিয়া’, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘আমার সন্তান’, লালন শাহর ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বাধীনতা’ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাঁকোটা দুলছে’ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।

উপনিবেশকালে অখণ্ড বাঙলাতে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের এমন মনোভাবের দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিশিষ্ট রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনা উল্লেখ করেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে। তার বই থেকে এখানে তুলে ধরা হল সেকালের অবস্থা। এতে বুঝতে পারা যায়, বর্তমানে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে সেগুলো অতীতেরই ধারাবাহিকতা।


১ম ঘটনাঃ

১৯২৪-২৫ সালে আমি যখন ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’তে সহকারী সম্পাদকের কাজ করিতাম, তখন আমার বেতন ছিল মাত্র পঞ্চাশ টাকা। এই টাকায় তৎকালে সচ্ছলে আমার চলিয়া যাইত। কিন্তু কিছু সঞ্চয় করিতে পারিতাম না। এই সময় কতকটা উপরি আয়ের আশায় কতকটা গ্ৰন্থকার হইবার শখে, ছেলেদের উপযোগী করিয়া কাছাছুল আম্বিয়ার কতকগুলি গল্প লইয়া একটি বই লিখিলাম। তার নাম রাখিলাম “মুসলমানী উপকথা” । বই লেখা সমাপ্ত করিয়া উহা প্ৰকাশের জন্য প্রকাশক ও ছাপাখানার সংগে দেন-দরবার করিতেছি, এমন সময় বাড়ি হইতে বাপজী জানাইলেন,শত খানেক টাকার জন্য তিনি একটা কাজে ঠেকিয়াছেন। ঐ পরিমাণ টাকা যোগাড় করা আমার দ্বারা সম্ভব হইলে তার খুবই উপকার হয়।ছেলের কাছে বাপের টাকা চাওয়ার এর চেয়ে মোলায়েম ভাষা আর হইতে পারে না। কিন্তু আমি বুঝিলাম নেহাত নিরুপায় না হইলে বাপজী আমার নিকট টাকা চাহিতেন না।

কিন্তু একশ টাকা যোগাড় করা তৎকালে আমাদের মতো পঞ্চাশ টাকার সাংবাদিকের পক্ষে কল্পনাতীত ব্যাপার ছিল।কাজেই ঠিক করিলাম, আমার জীবনের প্রথম বই ‘মুসলমানি কথা’র কপিরাইট বিক্রয় করিব। কপিরাইট যদি বিক্রয় করিতেই হয়, তবে যার নিমক খাই, তার কাছেই প্রথম যাচাই করা দরকার। কারণ তাদেরও ‘মোহাম্মদী বুক এজেন্সী’ নামক প্রকাশকের ব্যবসা ছিল। কাজেই আমার তৎকালীন মনিব মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র মৌলবি খায়রুল আনাম খাঁর নিকট প্রস্তাব দিলাম। তারা ছয় শত টাকার বেশি দিতে চাহিলেন না। অন্যত্র বেশি দাম পাইলে সেখানে কপিরাইট বিক্ৰয় করিতে তাদের আপত্তি নাই বলিয়া দিলেন।এই সংগে মওলানা সাহেব বইটির নামের মধ্য হইতে ‘উপ’ কথাটি বাদ দিয়া শুধু ‘মুসলমানি কথা’ নাম রাখিবার উপদেশ দিলেন।এ উপদেশ আমার পছন্দ হইল। ডাঃ দীনেশ চন্দ্ৰ সেনের ‘রামায়নী কথার’ অনুকরণে আমার বই-এর নাম রাখিলাম ‘মুসলমানি কথা” ।

বেশি দামের সন্ধানে ঘুরিতে-ঘুরিতে অবশেষে এগারোশ টাকা কপিরাইট বিক্রয় করিতে সমর্থ হইলাম।খরিদার বিখ্যাত প্ৰকাশক ও পুস্তক বিক্রেতা ভট্টাচার্য এন্ড সন্স। যথাসময়ে পাণ্ডুলিপি তাদের হাতে দিয়া এক’শ টাকা অগ্ৰিম লইলাম। বাকি হাজার টাকা পুস্তক ছাপা শেষ হওয়ার সংগে সংগে পাইব, কথা স্থির হইল।…ইতোমধ্যে ভট্টাচাৰ্য্য এন্ড সন্স রংগীন কালিতে বড়ো বড়ো হরফে বর্ডারসহ বই ছাপিবার জন্য ব্লকাদি করিয়া ফেলিলেন। একটা সম্পূর্ণ নূতন ধরনের চমৎকার শিশুপাঠ্য পুস্তক বাহির হইতেছে বলিয়া বিজ্ঞাপন বাহির হইল। সংগে সংগে আমার নামও প্রকাশ হইল।ভট্টাচাৰ্য এন্ড সন্সের এই সময়ে ‘শিশু সাথী’ নামে একটি সুন্দর শিশু মাসিক ছিল। এই শিশু মাসিকে ‘কারুনের ধন’ নামক মুসা ও কারুনের গল্পটি ছাপা হইয়া গেল।

কলিকাতার সাহিত্যিক সমাজে গল্পটির যথেষ্ট সমাদর হইল। আমার আনন্দ আর ধরে না। ঐ বই-এ আমার কোনোও স্বত্ব নাই। ওটা লাখ লাখ কপি বিক্রয় হইলেও তাতে আমার এক পয়সা লাভ হইবে না। এসব কোনোও কথাই আমার আনন্দে বিঘ্ন ঘটাইতে পারিল না।

কয়েকদিন পরই ভট্টাচাৰ্য্য এন্ড সন্সের মালিক আমাকে নিবার জন্য লোক ও গাড়ি পাঠাইলেন। আমি তাদের কর্নওয়ালিস স্ট্রীটস্থ দোকানো গেলাম।বই-এর কথা তুলিলেন। বই খুব জনপ্রিয় হইবে, গল্প ও ভাষা খুবই চমৎকার, ইত্যাদি। কয়েক কথার পরেই তিনি বলিলেনঃ “কিন্তু বই এ অনেক আরবি-ফারসি শব্দ আছে। এইগুলির ফুটনোট দিতে হইবে।” ভট্টাচাৰ্য্য মহাশয়ের কথা আমার পছন্দ হইল না। কিন্তু ভদ্ৰলোকের সংগে তর্ক করা যায় না, কারণ হাজার টাকা এখনো বাকি।কাজেই খুব সাবধানে অতি মোলায়েম ভাষায় যুক্তি ও দৃষ্টান্ত দিয়া বলিলাম যে অমন সুন্দর রংগীন কালির ছাপা শিশু পাঠ্য বইএ ফুটনোট একেবারে বেমানান হইবে। বই-এর সৌন্দর্য একদম নষ্ট হইয়া যাইবে।

ভদ্ৰলোক আমার যুক্তি মানিয়া লইলেন। কিন্তু ফুটনোটের বদলে ‘পরিশিষ্ট’ শব্দার্থ দিতে বলিলেন। পরিশিষ্টের বিরুদ্ধে খানিকক্ষণ এটা-ওটা যুক্তি দিয়া শেষ পর্যন্ত আসল যুক্তিটা বাহির করিলাম। বলিলামঃ আমার বইএ কোনোও আরবি-ফারসি শব্দ নাই।সবই বাংলা শব্দ।কাজেই পরিশিষ্টে শব্দার্থ দেওয়ার দরকার নাই। ভদ্রলোককে বুঝাইবার জন্য বলিলাম যে ঐসব শব্দের উৎপত্তি আরবি ফারসি ভাষা হইতে হইয়াছে বটে, কিন্তু যুগ-যুগান্তর ধরিয়া বাংলার জনসাধারণ ঐ সব শব্দ তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করায় ও সবই বাংলা হইয়া গিয়াছে।

বলিলামঃ যে সব শব্দ তিন বছরের নিরক্ষর বাঙালি শিশু বুঝতে ও বলিতে পারে, মূল যাই হোক, সে সব শব্দই বাংলা। দৃষ্টান্ত দিলাম ‘জংগল’ ও ‘জানালা’ দিয়া। দুইটাই ওলন্দাজ শব্দ। কিন্তু আমাদের দেশের মাটিতে উহারা এমন মিশিয়া গিয়াছে যে ও-গুলির বাংলা প্ৰতিশব্দ খুঁজিয়া বাহির করার কল্পনাও কেউ করে না।

ভদ্রলোক আমার কথায় বিরক্ত হইয়া বলিলেনঃ আমাকে ভাষা-বিজ্ঞান শিখাইবার চেষ্টা করিবেন না। আমি ব্যবসায়ী মানুষ। আমার বই বিক্রয় দিয়া কথা। ঐ সব শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ না দিলে হিন্দুরা বুঝিতে পারিবে না। মুসলমানরা ঐসব শব্দ ব্যবহার করিলেও হিন্দুরা করে না। আমি যখন ভদ্রলোককে বলিলাম যে হিন্দুরা ও-সব শব্দ সাধারণত ব্যবহার না। করিলেও তারা সকলেই বুঝিতে পারে, তখন ভদ্ৰলোক ধৈৰ্য হারাইয়া বলেন যে তবু ওগুলি আরবি-ফারসি শব্দ, বাংলা শব্দ নয়।আমিও রাগ করিয়া প্রশ্ন করিলামঃ শতকরা ছাপ্পান্ন জন বাঙালির মুখের ভাষাকে আপনি বাংলা স্বীকার করেন না? দেশের দুর্ভাগ্য?

আমি তখন পুরা কংগ্রেসী । মাথা হইতে পা পর্যন্ত মোটা খদ্দর। তিনি নূতন করিয়া আমার পোশাকের দিকে চাহিয়া বলিলেনঃ দেখুন, আমি ব্যবসায়ী। আপনার সাথে আমি দেশের ভাগ্য লইয়া তৰ্ক করিতে চাই না। আমার শুধু জানা দরকার আপনি ঐ সব শব্দের বাংলা প্ৰতিশব্দ দিবেন কি দিবেন না? ভদ্রলোকের সুরে অশুভ ইংগিত ফুটিয়া উঠিল। আমি অপেক্ষাকৃত নরম হইয়া বলিলামঃ আমাকে ব্যাপারটা বুঝিতে দেন। আপনি কি বলিতে চান, পরিশিষ্টে ‘পানি’ অর্থ ‘জল’ ‘আল্লাহ’ অর্থ ‘ঈশ্বর’ ‘রোযা’ অর্থ ‘উপবাস’ এইভাবে ওয়ার্ড বুকের মতো শব্দার্থ লিখিয়া দিতে হইবে?

আমি অনেকটা নরম হইয়াছি মনে করিয়া ভদ্রলোক খুশি হইলেন বিনীতভাবে বলিলেনঃ আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিক ধরিয়াছেন।

আমিঃ তা হইলে আমাকে স্বীকার করিতে হইবে যে পানি, আল্লাহ, নমায, রোযা এসব শব্দ বাংলা নয়? জল, ঈশ্বর, উপাসনা ও উপবাসই বাংলা শব্দ?

ভদ্রলোক একটু ভাবিয়া বলিলেনঃ না, তা কেন? বাংলা শব্দেরও কি বাংলা প্রতিশব্দ থাকে না? ঈশ্বর অর্থ ভগবান, জল অর্থ বারি, এ সব কথা কি আমরা বলি না?

আমি বলিলামঃ ঠিক আছে। আপনার কথাই মানিয়া লইলাম।ঐ সব শব্দের প্রতিশব্দ আমি লিখিয়া দিব।কিন্তু এক শর্তে।

ভদ্রলোক খুশিতে হাসিতে লাগিলেন। অকস্মাৎ মুখের হাসির বদলে চোখে কৌতুহল দেখা দিল। বলিলেনঃ কি শর্ত?

আমিঃ আপনি বহু হিন্দু গ্ৰন্থকারের বই-এর প্রকাশক। তাঁদের ডাকিয়া রাযী করুনঃ তাদের বই-এর পরিশিষ্টের শব্দার্থে ঈশ্বর অর্থ আল্লাহ, জল অর্থ পানি, উপবাস অর্থ রোযা; ইত্যাদি যোগ করিবেন।এতে রাযী আছেন। আপনি?

ভদ্রলোক রাগে ফাটিয়া পড়িলেন। এর পর যা কথাবার্ত হইল তার খুব স্বাভাবিক পরিণতি হইল আমার জন্য খুব খারাপ। ভদ্রলোক স্পষ্ট বলিয়া দিলেন, আমার সাথে তার চুক্তি বাতিল। তিনি কপিরাইট কিনিলেন না। ব্লক তৈয়ার করিতে তার যে হাজার খানেক টাকা খরচ হইয়া গিয়াছে, তা তিনি আমার কাছে দাবি করিলেন না। আমার অগ্ৰিম নেওয়া একশত টাকা ফেরৎ দিয়া যে কোনোও দিন আমি পাণ্ডুলিপি ফেরৎ নিতে পারি বলিয়া ভদ্রলোক চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া পড়িলেন। অগত্যা আমিও উঠিলাম। ‘আদাব’ বলিয়া বাহির হইলাম।

…আফিসে ফিরিয়া খাঁয়রুল আনাম খাঁ সাহেবকে সব বলিলাম।…যথা সময়ে মোহাম্মদী বুক এজেন্সী আমার ‘মুসলমানি কথা’ প্রকাশ করিলেন।

…বাংলার মেজরিটি মুসলমানের মুখের ভাষাকে বাংলা ভাষা বলিয়া স্বীকার করিল না বাংলার মাইনরিটি হিন্দুরা? এ অবস্থা চলিতে থাকিলে মুসলমানের ত ভালো হইবেই না, সারাদেশের, সুতরাং হিন্দুরও, ভালো হইবেনা।

২য় ঘটনাঃ আল্লা, খোদা থাকায় পাঠ্যপুস্তক বাতিল

আমি তখন ময়মনসিংহ জজকোর্টে ওকালতি করি। নতুন উকিল। পশার খুব জমে নাই। সাহিত্যিক নেশায় এবং উপরি আয়ের জন্য ‘নয়া পড়া’ নামক চার খণ্ডের একখানা শিশু পাঠ্য বই লিখি। চার খণ্ড বই মকতবের চার ক্লাসের জন্য টেক্সট বুক কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়।এই চারখানা বই হইতে আমি যথেষ্ট টাকা-কড়ি পাইতে থাকি।তিন বছর মুদ্দত পার হয়-হয় অবস্থায় বাংলার প্রাইমারি এডুকেশন অ্যাক্ট পাস হয়।এই নতুন আইনে প্রাইমারি স্কুল ও মকতব এক করিবার বিধান হয়।আমার ‘নয়া পড়া’ অনুমোদিত পুস্তকগুলির মধ্যে ‘এ’ ক্লাসের বই ছিল।সুতরাং নতুন বিধানেও আমার বই পাঠ্য পুস্তক থাকিয়া যাইবে, একথা প্রকাশকসহ সকলেই বলিলেন। ‘নয়া পড়ার’ চাহিদা বাড়িয়া যাইবে। আমার আয়ও বাড়িবে, এই আশায় আমি গোলাপি স্বপ্ন দেখিতে থাকিলাম।

এমন সময় টেক্সট বুক কমিটির তরফ হইতে এক পত্রে আমাকে জানান হইল যে আমার ‘নয়া পড়া’ নতুন আইনে পাঠ্য পুস্তকরূপে অনুমোদিত হইয়াছে, তবে উহাতে যে সব আরবি-ফারসি শব্দ আছে, সে সব শব্দের জায়গায় বাংলা প্রতিশব্দ বসাইতে হইবে।

বারো বছর আগেকার ঘটনা মনে পড়িল। তখন ছিলেন ভট্টাচাৰ্য অ্যান্ড সন্স, এবার স্বয়ং টেক্সট বুক কমিটি মানে, খোদ সরকার। কিন্তু আমিও আজ বারো বছর আগের অসহায় লোকটি নই। ইতোমধ্যে দেশে বিরাট পরিবর্তন হইয়াছে।কৃষকপ্ৰজা পার্টির নেতা হক সাহেব প্রধানমন্ত্ৰী শিক্ষামন্ত্রী হইয়াছেন।তাঁর আমি একজন প্রিয় শিষ্য।তাকে প্রধানমন্ত্রী করার ব্যাপারে আমার যথেষ্ট হাত আছে।হক সাহেব আমার কোনোও কথাই ফেলেন না।

অতএব টেক্সট বুক কমিটিকে আমার সেই পুরাতন মত জানাইলাম যা ভট্টাটাৰ্য্যকে জানাইয়াছিলাম।টেক্সট বুক কমিটি, কিন্তু ভট্টাচাৰ্য্যকে ছাড়াইয়া গেলেন।তারা অন্যান্য যুক্তির সংগে এটাও জানাইলেনঃ

‘আল্লা’ ‘খোদা’ ‘পানি’ ইত্যাদি শব্দ প্রাইমারি পাঠ্যপুস্তকে থাকিলে হিন্দু ছাত্রদের ধর্মভাবে আঘাত লাগিবে। আমার মাথায় আগুন চড়িয়া গেল। আমি জানাইলাম, একশ বছরের বেশি বাংলার মুসলমান ছাত্ররা পাঠ্য-পুস্তকে ‘ঈশ্বর’ ‘ভগবান’, ‘জল’ পড়াতেও যদি তাদের ধর্মভাবে আঘাত লাগিয়া না থাকে, তবে এখন হইতে ‘আল্লা’ ‘খোদা’ পড়িয়া হিন্দুদেরও ধর্মভাবে আঘাত লাগা উচিৎ নয়।
আমার যুক্তি ভট্টাচাৰ্যও যেমন মানেন নাই, টেক্সটবুক কমিটিও মানিলেন না। আমাকে জানাইয়া দিলেন, অত্র অবস্থায় আমার বই বাতিল করিয়া দিতে তাঁরা বাধ্য হইলেন বলিয়া দুঃখিত।

আমি রাগ করিলাম না। মনে মনে হাসিলাম। বেচারা টেক্সট বুক কমিটি জানেন নাঃ কার বই তাঁরা বাতিল করিলেন।তাঁরা জানেন না, প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী হক সাহেবকে দিয়া আমি শুধু তাদের এই বাতিল অর্ডারই বাতিল পারি না। তাদের চাকরি পর্যন্ত ‘নট’ করিয়া দিতে পারি। অবশ্য আমি বেচারাদের চাকরি সত্য-সত্যই ‘নট’ করিব না। তবে সে মর্মে ধমক দিয়া তাঁদের ভবিষ্যতের জন্য হুশিয়ার করিয়া দিতে আমি কলিকাতা গেলাম।

হক সাহেব যথারীতি হৈ চৈ করিলেনঃ টেক্সট বুক কমিটি ভাঙিয়া গড়িবেন, কর্মচারীদের ডিসমিস করিবেন বলিয়া হুংকার দিলেন। তাঁদের কৈফিয়ত তলব করিলেন।আমি আশ্বস্ত হইয়া এবং কারও চাকরি নষ্ট না করিতে হক সাহেবকে পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করিয়া ময়মনসিংহ ফিরিয়া আসিলাম।

বহুদিন অপেক্ষা করিবার পর আবার কলিকাতা গেলাম। এইবার হক সাহেব আমাকে জানাইলেন যে ‘হিন্দু বদমায়েশ অফিসার’দের জ্বালায় তিনি কিছু করিতে পারিলেন না। বিলম্বও হইয়া গিয়াছে যথেষ্ট।এখন পাঠ্যবই বদলাইলে ছাত্রদের অসুবিধা হইবে।আমারও আর্থিক লাভ বিশেষ হইবে না।তবে আগামী বছর যাতে আমার বই অবশ্য পাঠ্য হয়, সে ব্যবস্থা তিনি নিশ্চয় করিবেন।

আমি এতদিন ব্যাপারটার আর্থিক দিক মোটেই ভাবিতেছিলাম না।হক সাহেবের আশ্বাসের পর সে বিষয়েও আমি সচেতন হইলাম। কিন্তু তার প্রতিশ্রুত আগামী বছর আর আসিল না। বাঙালি মুসলমানদের মুখের ভাষা বাংলা সাহিত্যে স্বীকৃতি পাইবার প্রয়াসে ইহাকে আমার আরেকটা স্যাক্রিফাইস বলিয়া অবশেষে নিজের মনকে সান্তনা দিলাম।

[উৎসঃ আবুল মনসুর আহমদ, আত্মকথা, আহমদ পাবলিশিং হাউজ, তৃতীয় মুদ্রণ, ২০১৪ পৃঃ২২৪-২২৯]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen + 17 =