যে মসজিদে মুসলমানদের বিজয়ের স্মৃতিচিহ্ন

যে মসজিদে মুসলমানদের বিজয়ের স্মৃতিচিহ্ন

হিজাজ অঞ্চল বা বর্তমান সৌদি আরবের মিনায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘আল-খাইফ’ মসজিদ নিয়ে আলোচনা করবো।

মক্কায় অবস্থিত মসজিদুল হারাম থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে মিনা অঞ্চলে এই গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল মসজিদটি অবস্থিত। পাহাড়ের চেয়ে নীচু এবং সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচু স্থানকে আরবি পরিভাষায় খাইফ বলা হয়। এ ছাড়া, দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকাসম ভূমিকেও খাইফ বলে। এই মসজিদে নামাজ পড়ার অনেক ফজিলত থাকায় এখানে নামাজ আদায়ের জন্য মুসলমানদের বিশেষভাবে তাগিদ দেয়া হয়েছে। বলা হয়, ৭৫ জন নবী মসজিদুল হারাম তাওয়াফ করতে এসে খাইফ মসজিদে নামাজ আদায় করেছেন। কাজেই কারো পক্ষে যদি এই মসজিদে নামাজ পড়ার সুযোগ তৈরি হয় তাহলে সে যেন তা হাতছাড়া না করে।

খাইফ মসজিদ হচ্ছে মক্কার কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের স্মৃতিচিহ্ন। ইতিহাসে এসেছে, পঞ্চম হিজরিতে ইহুদিদের প্ররোচনায় মক্কার কাফেররা ইসলামকে সমূলে উপড়ে ফেলার লক্ষ্যে মদীনায় হামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ লক্ষ্যে তারা কিছু আরব গোত্রের সঙ্গে সন্ধি চুক্তি করে। এই সন্ধি চুক্তি করার জন্য মক্কার কাফেররা যে স্থানটি বেছে নেয় পরবর্তী সেখানেই আল-খাইফ মসজিদ নির্মিত হয়। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফের গোত্রগুলোর ঐক্যের ব্যর্থতার নিদর্শন হিসেবে ইসলামের বিরুদ্ধে মুশরিকদের ষড়যন্ত্রের স্থানে মসজিদটি নির্মিত হয়।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, মহানবী (সা.) তাঁর জীবনের শেষ বছরে বিদায় হজ্বের পর মক্কা থেকে মদীনায় ফিরে যাওয়ার সময় খাইফ মসজিদে মূল্যবান খুতবা দিয়েছিলেন। ওই খুতবায় তিনি মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেন এবং আল্লাহর আইনের মোকাবিলায় সব মুসলমানের সমান অধিকার ঘোষণা করেন। এরপর তিনি নিজের মৃত্যুর পর খেলাফত প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, “যারা আমার এ বক্তব্য মনযোগ দিয়ে শুনবে, অন্তরে ধারণ করবে এবং যারা শোনেনি তাদের কানে পৌঁছে দেবে তাদের জীবন আল্লাহ সাফল্যমণ্ডিত করবেন। হে জনগণ, যারা উপস্থিত আছো তারা অনুপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে আমার এ বক্তব্য পৌঁছে দেবে। আমি তোমাদের কাছে দুটি মূল্যবান জিনিস রেখে যাচ্ছি।”

সমবেত জনতা এ সময় জিজ্ঞাসা করেন: “ইয়া রাসূলুল্লাহ! ওই দুই মূল্যবান বস্তু কি কি?” উত্তরে মহানবী বলেন, “আল্লাহর কিতাব ও আমার আহলে বাইত। দয়ালু ও মহাজ্ঞানী আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন, এই দুই বস্তু কিয়ামতের দিন হাউজে কাওসারে আমার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবে না।” অবশ্য খাইফ মসজিদের এই খুতবার পর বিশ্বনবী (সা.) মদীনা অভিমুখে আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে গাদিরে খোম নামক স্থানে আহলে বাইত সম্পর্কে আরো বিস্তারিত ও দীর্ঘ বক্তৃতা দান করেন। সেখানে তিনি আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)’র বেলায়েত ঘোষণা করে বলেন, আমি যাদের মওলা ও ওলি আমার পরে আলী তাদের মওলা ও ওলী।

খাইফ মসজিদে রাসূলুল্লাহ (সা.) যেখানে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেছিলেন ওসমানীয় শাসনামলে সেখানে একটি বড় গম্বুজ ও মেহরাব তৈরি করা হয়। ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, ২৪০ হিজরিতে এক প্রলয়ংকর বন্যায় খাইফ মসজিদ ধসে পড়ে। তবে বন্যা শেষ হওয়ার পরপরই মসজিদটি পুনর্নির্মিত হয় এবং এর চারপাশে বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়। সে সময় এই মসজিদের দৈর্ঘ্য ছিল ১২০ মিটার এবং প্রস্থ ছিল ৫৫ মিটার। সে হিসাবে এটি ছিল সে সময় হিজাজ উপত্যকার সবচেয়ে বড় মসজিদ। এমনকি তখন মসজিদুল হারামের চেয়েও বড় ছিল এই মসজিদের আয়তন। পরবর্তীতে ৮৭৪ হিজরিতে মিশরের মামলুকি সুলতান কাইত্‌বা এই মসজিদ আরেকবার পুনর্নির্মাণ করেন। মসজিদের ওই স্থাপনাটি কয়েক দশক আগ পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল।

এখন থেকে তিন দশক আগে ১৪০৭ হিজরিতে এই মসজিদ পরিবর্ধন ও পুনর্নির্মাণের এক বিশাল পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়। এ সময় মসজিদের আয়তন আগের চেয়ে চারগুণ বাড়িয়ে প্রায় ২৫ হাজার বর্গমিটার করা হয়। খাইফ মসজিদে বর্তমানে ৩০ হাজার মুসল্লি একত্রে জামায়াতে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের চারকোণায় অবস্থিত চারটি সুউচ্চ মিনার মসজিদটিকে দান করেছে অপার সৌন্দর্য। এবারের পুনর্নির্মাণের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.)’র স্মরণে নির্মিত মেহরাব ও গম্বুজ ভেঙে ফেলা হয়। প্রতি বছর হজের মওসুমে মিনায় শয়তানের প্রতিকৃতিতে পাথর নিক্ষেপের সময়টাতে এই মসজিদ মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। বছরের বাকি সময় প্রায়ই মসজিদটি বন্ধ পাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 + twelve =