যে কারণে কওমি মাদ্রাসার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা

যে কারণে কওমি মাদ্রাসার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা

বাংলাদেশের মাদ্রাসায় সবার প্রথমে পবিত্র কোরআন, হাদীস, পবিত্র কোরআন হাদীস থেকে উদ্ভুত মাসয়ালা মাসায়েল শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। নবী হযরত মোহাম্মদ (স) এর উপর আল্লাহ তায়ালা যে ওহী নাজিল করেছেন তা তিনি মক্কা শরীফে দারুল আরাকামে শিক্ষা দিতেন।
নবীজীর দূত হযরত মোসয়াব ইবনে উমায়ের (রাঃ) মদীনায় নবীজির হিজরতের পূর্ব থেকেই নবীজির দূত হিসেবে সেখানে কোরআন শরীফ শিক্ষা দিতেন।

বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) মদীনায় যাবার পর আসহাবে সুফফায় মাদ্রাসা কায়েম করেছিলেন। বিশ্বনবী (স) যেই কোরআন আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং তিনি নিজে যে জীবন্ত ওহী ছিলেন তার মাধ্যমে সাহাবীদের শিক্ষা দিতেন।

পরবর্তীতে ইসলামের ইতিহাসে যেসব জায়গায় মুসলমানদের আবাস হয়েছিল সে জায়গাতেই ফকিহগন, মোহাদ্দীসগন, মোফাসসিরগণ ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতেন।

ইমাম আবু হানিফা(র), ইমাম আহমদ (র), ইমাম মালিক (র), ইমাম শাফেই (র), সুলতান সালাহউদ্দিন আয়ইয়ুবী (র) সহ যেসব ব্যাক্তিত্বদের মাধ্যমে এ পৃথিবীতে ইসলামের প্রচার প্রসার ও জ্ঞানচর্চা হয়েছে তারা সকলেই সেই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন যেখানে কোরআন হাদীস একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য আখেরাতকে সামনে রেখে অধ্যয়ন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে যে কওমী মাদ্রাসা রয়েছে সেখানে নবীজী(স) এর রেখে যাওয়া সম্পদ কোরআন হাদীসের ইলম শিক্ষা দেওয়া হয়।

কওমি মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা অর্জন করে যাবার পর সরকারি ও বেসরকারি চাকরি তাদের ভাগ্যে নসীব হয় না। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত না থেকেও জঙ্গি ও সন্ত্রাসী তাদেরকেই আখ্যায়িত করা হয়। বলা হয় মৌলবাদী। প্রগতির পথে তাদেরকেই অন্তরায় বিবেচনা করা হয়।

নারীদেরকে ব্যাবসার ও ভোগের উপকরণ বানাতে চায় না বলে তাদেরকেই নারীবিরোধী আখ্যায়িত করা হয়, বাসে পুলিশি তল্লাশির সময়ও ৫০ জন যাত্রীর মধ্যে শুধুমাত্র তাকেই তল্লাশি করা হয় যাদের গায়ে পাঞ্জাবি জোব্বা মাথায় টুপি পাগড়ি থাকে।

মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে এসকল দুর্ণাম ও অপপ্রচার থাকার পরেও মানুষ মাদ্রাসায় পড়ছে। আপনি যদি বাংলাদেশের সকল সিনেমা হলে যান তাহলে মাদ্রাসা থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত একজন মৌলভিও খুঁজে পাবেন না যারা নারীদের নগ্ন দেহ প্রদর্শনের ব্যবসায় লিপ্ত।

বাংলাদেশে রাস্তায় বাস চলাচলের সময়, এলাকায় বাড়ি বানানোর সময়, নতুন কোন কাজ শুরু করা সময় লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয় আপনি একজন মাদ্রাসার মাওলানাও খুঁজে পাওয়া যাবে না চাঁদাবাজিতে জড়িত।

বাংলাদেশের জমিনে আজ পর্যন্ত যত ধর্ষণ সংগঠিত হয়েছে তাদের মধ্যে খোঁজ নিয়ে আপনি কতজন মাওলানা ধর্ষণের সাথে জড়িত পাবেন? বাংলাদেশে বসবাসরত কত মানুষ দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে এর মধ্যে কতজন মৌলভী রয়েছেন?

বাংলাদেশের প্রত্যেক থানায় এলাকার সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী, চোর ডাকাত, চাঁদাবাজদের লিস্ট রয়েছে তাদের মধ্যে মাদ্রাসায় শিক্ষায় শিক্ষিত একজনও খুঁজে পাবেন না।

বাংলাদেশের দুর্নীতির ময়দান গরমকরা কয়জন মৌলভী রয়েছেন? বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ জায়গায়, মেলায় জুয়ার আসর বসে সেখানে একজন মাওলানাও খুঁজে পাবেন না যে জুয়ার আসর সরগরম করছে।

বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে হাজার হাজার মেয়ে ইভটিজিং এর শিকার হয়, এরা যাদের দ্বারা ইভটিজিং এর শিকারী অর্থাৎ ইভটিজারদের মধ্যে একজন দাড়ি-টুপিওয়ালা কওমী মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষক খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশের যুব সমাজ আজ মাদকাসক্ত, নেশার কবলে আজ কত পরিবারের সুখ শান্তি বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশের কোন কওমী মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষক নেশার সাথে জড়িত?

বাংলাদেশের মধ্যে যত সন্ত্রাস অসামাজিক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে আপনি আপনার মনকে জিজ্ঞেস করুনতো কতগুলো কর্মকান্ডের মধ্যে বাংলাদেশের এই কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা জড়িত?

বাংলাদেশের কত গৃহবধূকে যৌতুকের বলির শিকার হতে হয়েছে আপনি চিন্তা করুন তো কতজন শিকারী কওমী মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা প্রাপ্ত?

যতগুলো অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকান্ডের কথা আমি উল্লেখ করলাম এই নিরীহ মাদ্রাসা শিক্ষিতদের কি ক্ষমতা ছিল না এই সকল অপরাধ করার?

অবশ্যই যেসকল মানুষ যে রকম হাত পা আছে তাদেরও তো তেমই রয়েছে। সাধারণ মানুষের বিবেচনায় যেসকল মানুষ সমাজে অভাবী ও দরিদ্র গোছের তাদের তো আরও বেশি যৌক্তিকতা ছিল অপরাধে জড়িত হওয়ার। কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো। অন্যায় ও অপরাধ করার ক্ষমতা, অসামাজিক কর্মকাণ্ড করার ক্ষমতা তাদের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে না কেন? একটা মাত্র কারণ আর সেটি হল নবী হযরত মোহাম্মদ (স) এর কাছে নাজিলকৃত ওহী এবং নবীজীর আদর্শের শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া।
বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন নীতিমালা, বাংলাদেশের ইসলামবিরোধী শিক্ষানীতি, পত্র-পত্রিকায় এবং ব্লগে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স) কে ব্যাঙ্গ করা, সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস তুলে ফেলা, অগ্নিশিখা প্রজ্জলনের মাধ্যমে সারা দেশে শিরক চালুর সুগভীর যড়যন্ত্রসহ সকল ইসলাম বিরোধী যড়যন্ত্রের মোকাবিলায় বাংলাদেশের মানুষের ইসলামী মূল্যবোধের সংরক্ষনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে সবার আগে যারা এগিয়ে আসে তারা হল এই কওমী মাদ্রাসার সাথে সংশ্লিষ্টরা।

যদি বাংলাদেশে এই কওমী মাদ্রাসা না থাকত তাহলে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণাও থাকত না।

স্পেনে মুসলিম শাসন অবসান হয়ে যাওয়ার পর আজ স্পেনের মসজিদগুলো আর মসজিদ নেই। গৌরবোজ্জ্বল স্পেন থেকে মুসলমান ও ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

কিন্তু এই ভারতীয় উপমহাদেশ প্রায় দুইশত বছর ইংরেজরা শাসন করেছে। ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, চেতনা সবকিছু নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে নিরলসভাবে। হাজার হাজার কোরআন মাজীদ পুড়ানো হয়েছে ইসলাম ও মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্যই। হাজার হাজার আলেমকে শহীদ করে দেয়া হয়েছে শুধু নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি তাদের চেতনাকে,তাদের আকাঙ্ক্ষাকে।

শুধুমাত্র বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানে ৭০ কোটির বেশি মুসলমান রয়েছে যাদের ঈমান আমল ইসলামী চেতনার হেফাজত করেছে এই কওমী মাদ্রাসা।

পশ্চিমা বিশ্বেও ইসলামের প্রচার প্রসার ও প্রতিষ্ঠার পেছনে কওমী মাদ্রাসার সংশ্লিষ্টদের অবদান অনেক। তাদের কর্মপরিকল্পনা ও সুদুরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আজ বিশ্ব ইসলামের নেতৃত্ব মূলত এই কওমী মাদ্রাসার হাতেই রয়েছে।

কওমী মাদ্রাসার এ মৌলভীরা সকল মিথ্যা অপবাদ আর বিরোধিতার বোঝা মাথায় নিয়েও আজান তারাই দেয়, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান তারাই করে, কোরআন হাদীসের জ্ঞান তারাই মানুষকে জানায়। যেকল মানুষের কষ্ট, মোজাহাদা আর মেহনতের কারণে আমরা আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে জানতে পারছি, যারা আমাদেরকে মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, যারা আমাদেরকে সুমধুর আজানের সুর শুনাচ্ছে, কোরআনের সুমধুর তেলাওয়াত শুনাচ্ছে, তারা অপরাধী না হয়েও অপরাধের শিকার তাদের প্রতি আজ আমাদের হৃদয়ের সুগভীর থেকে শ্রদ্ধা আসা দরকার।

লেখক: শিক্ষার্থী, আনন্দমোহন কলেজ, ময়মনসিংহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − 6 =