কুরআনের ধারক ও বাহক হযরত মুহাম্মদ (স) [শেষ পর্ব]

কুরআনের ধারক ও বাহক হযরত মুহাম্মদ (স) [শেষ পর্ব]

কাফির-মুশরিকরা নানাভাবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স)-কে গুপ্তহত্যার চেষ্টা করল। ঐক্যবদ্ধভাবে সশস্ত্র আক্রমণ করে শেষ করে দেয়ার পরিকল্পনাও করল। কিন্তু তিনি সমস্ত বাধার পাহাড় অতিক্রম করে তাঁর অভিষ্ট লক্ষ্যে অগ্রসর হতে থাকেন।

এই ছিল তাঁর অবস্থার বৈপ্লবিক দিক। অপর দিকটি এর চেয়েও অধিক হতবাককারী। চল্লিশ বছর ধরে তিনি ছিলেন সাধারণ আরবদের মতোই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একজন আরব। এই বয়সে কেউ তাঁকে অনলবর্ষী বক্তা, যাদুকরী প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্বরূপে লক্ষ্য করেনি। ধর্মত্ত্ব, দর্শন, নীতিশাস্ত্র, আইন-কানুন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সমরবিদ্যা সম্পর্কে তাঁর কোনো আলোচনা কেউ শুনেনি।

তাঁর মুখ থেকে আল্লাহ, ফেরেশতা, নবী-রাসূল, আসমানী কিতাব, পার্থিব জীবন, কিয়ামত, আখেরাত এবং জান্নাত-জাহান্নামের কোনো আলোচনা শোনা যায়নি। পবিত্র পরিত্র, ভদ্র ব্যবহার এবং সর্বোত্তম জীবন চরিতের অধিকারী তিনি অবশ্যই ছিলেন, কিন্তু চল্লিশ বছর যাবত তাঁর থেকে এমন কোনো অস্বাভাবিক বক্তব্য কখনো শুনা যায়নি যার ভিত্তিতে বলা যেতো যে, তিনি একটা কিছু হতে চান। এই সময় পর্যন্ত তাঁর সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিগণ তাঁকে কেবল একজন নীরব, শান্তিপ্রিয় এবং নেহায়েত শরীফ মানুষ হিসেবে জানতো।

কিন্তু নূরের পর্বত থেকে নেমে এসে এখন তিনি একজন মহাজ্ঞানী, নৈতিক ও সামাজিক সংস্কারক, বিস্ময়কর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, জবরদস্ত আইনবেত্তা, সর্বোচ্চ ন্যায়পরায়ণ বিচারপতি, আত্মিক ও আধ্যাত্মিক সংস্কারক ও অতুলনীয় সেনানায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন।

এই অক্ষরজ্ঞানহীন মরুচারী জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন সব কথা বলে যাচ্ছেন যা তাঁ আগে না কোথাও কেউ বলেছে, আর না তাঁর পরে কেউ বলতে সক্ষম হয়েছে।

সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, সামাজিক আচরণ, আর্থিক লেনদেন, পারিবারিক নীতি-নিয়ম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তিনি এত উন্নত স্তরের আইন প্রণয়ন করলেন যে, স্বনামধন্য জ্ঞানী-গুনী বুদ্ধিজীবী জীবনভর অনুসন্ধান ও অনুশীলনের পর অতি কষ্টেই এর নিগূঢ় তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে।

এই নীরব শান্তিপ্রিয় মানুষটি জীবনে কখনো যুদ্ধ করেননি। কিন্তু আলোর পাহাড় থেকে নেমে আসতে আসতে এমন এক বীর সেনানীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন যে, ভয়াবহ যুদ্ধসমূহেও তাঁর কদম নিজ স্থান থেকে ইঞ্চি পরিমাণও বিচ্যুত হয়নি। মাত্র নয়টি বছরের মধ্যে সমগ্র আবর ভূখণ্ড (১২ লাখ বর্গমাইল) তাঁর কর্তৃত্বাধীন হয়ে গেল।

এই মহাবীর সেনানীর তত্ত্বাবধানে সহায়-সম্বলহীন আরব জাতি মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তৎকালীন পৃথিবীর দুটি পরাশক্তির (পারস্য ও বায়জান্টাইন) বিলুপ্ত ঘটালো।

সেই শান্তিপ্রিয় মানুষটির মধ্যে রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির প্রতি সামান্যতম আকর্ষণও মানুষ এই চল্লিশ বছরে লক্ষ্য করেনি।

হেরার গুহা থেকে কদমে কদমে এগিয়ে এসে তিনি একম মহান রাষ্ট্রনায়করূপে আবির্ভূত হলেন। মাত্র তেইশটি বছরের মধ্যে পাহাড়-পর্বত ঘেরে বারো লক্ষ বর্গমাইলের মধ্যে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, প্রায় সাড়ে তিনশত গোত্রে ও উপগোত্রে বিভক্ত, বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন, যুদ্ধবাজ, মূর্খ, বিদ্রোহী, বর্বর, আন্তঃগোত্রীয় কোন্দলে জর্জরিত, নিয়ম-নীতির প্রতি শ্রদ্ধাহীন জাতিকে একটি ধর্ম, একটি সংস্কৃতি, একইরূপ আইনব্যবস্থা এবং একটি মাত্র রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনুগত বানিয়ে দিলেন।

তিনি সাথে করে নূরের গুহা থেকে কী নিয়ে এলেন যার পরশে আরবজাতির স্বভাবে, আচরণে, চরিত্রে, তাকওয়া ও প্রশংসনীয় আখলাকে পরিবর্তিত করলেন। তাদের বিদ্রোহ ও নৈরাজ্যকে আইনের প্রতি একান্ত অনুগত বানিয়ে দিলেন।

কী সেই কিতাব যার পাঠ দান করে তিনি একটি বন্ধ্যা জাতিকে, যাদের মধ্যে শত শত বছরেও ইতিহাস বিখ্যাত একটি মানুষেরও আবির্ভাব হয়নি, তাদেরকে এমন এক সুবিখ্যাত মানবগোষ্ঠীর জন্মদাতা বানিয়ে দিলেন যে, তাদের বংশে হাজার হাজার বীরপুরুষ আবির্ভূত হলেন। তারা দুনিয়াবাসীকে চরিত্র-নৈতিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির পাঠদানের জন্য সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লেন।

সেই শান্তিপ্রিয় মানুষটি যুলুম-অত্যাচার, শক্তিপ্রয়োগ ও প্রতারণা-প্রবঞ্চনার আশ্রয় নিয়ে এসব কাজ করেননি। বরং অন্তর বিমগ্ঘকারী চরিত্র ও অন্তরাত্মাকে জয়কারী সভ্য আচরণ এবং মন-সস্তিষ্ককে পরাভূতকারী কুরআনিক শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে এসব কাজ করেছেন। কুরআনের হৃদয়গ্রাহী ও আবেদনময়ী বাণী পেশ করে শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে ছিলেন, তাদের অন্তর বিগলিত করেছেন। ন্যায়-ইনসাফের রাজত্ব কায়েম করেছেন। নিজের প্রতি প্রস্তর বর্ষণকারী শত্রুকেও ক্ষমা করেছেন।

আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত জিবরাঈল আমীন যে কিতাবখানি চৌদ্দশত বছর আগের অন্ধকার যুগে ঊষর মরুভূমির অক্ষরজ্ঞানহীন এক পূর্ণ বয়সী যুবকের হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি সেই কিতাবের পাঠদান করে আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেন। এটা কেবল মুসলমানদেরই কিতাব নয়। যারা এই কিতাবের সমালোচনা করে এটি তাদেরও কিতাব। তাদের জীবনযাত্রার মূলনীতি ও কর্মবিধানে এবং তাদের যুগের প্রাণসম্পন্দনের তাদের অজান্তে এই কিতাব ক্রিয়াশীল।

লেখক: মাওলানা মুহাম্মদ মূসা, বিশিষ্ট তাফসীরকারক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − 8 =