কুরআনের ধারক ও বাহক মুহাম্মদ (স) [পর্ব-১]

কুরআনের ধারক ও বাহক মুহাম্মদ (স) [পর্ব-১]

পবিত্র কুরআন এক বিস্ময়কর কিতাব এবং এর ধারক ও বাহক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) এক বিস্ময়কর মহামানব। তাঁর জন্মের পর আরবরা যদি জানতে পারতো যে, তিনিই হবেন বিশ্বনবী, কিয়ামত পর্যন্ত জিন ও ইনসানের পথপ্রদর্শক মহান নেতা, তাহলে তারা লাত, মানাত, উজ্জা ও হুবলের পূজা ত্যাগ করে এই শিশুটিকেই পূজনীয় বানাতো।

তিনি এমন এক মহান ব্যক্তিত্ব যে, প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্ত তাঁকে নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, তাঁর চর্চা হচ্ছে। তিনি এমন এক কিতাবের বাহক যে, সিটি নিয়েও অহরাত অধ্যয়ন ও গবেষণা চলছে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল সমাজে।

এনসাইক্লোপেডিয়া বৃটানিকার মতে, মুদ্রণের সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে বাইবেল সবার উপরে, কিন্তু পাঠকসংখ্যার বিবেচনায় আল-কুরআন শীর্ষে।

এ কেমন প্রভাবশালী কিতাব! এই কিতাবের চর্চা চৌদ্দ শত বছর ধরে আরবী ভাষাকে মানুষের বোধগম্যের স্তরে ধরে রেখেছে। অথচ কতো ভাষা এই দীর্ঘ কালপরিক্রমায় হারিয়ে গেছে। অবোধগম্য ও অব্যবহার্য হয়ে পরিত্যক্ত হয়েছে। দেড় হাজার বছর আগের আরবী আজো সহজে বোধগম্য। অথচ এ ভাষা আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে আফ্রিকা মহাদেশের বিরাট অঞ্চলব্যাপী আরব মাতার ভাষা।

কুরআনের ধারক ও বাহক মুহাম্মদ (স)

যাঁকে এ কিতাব দেয়া হয়েছিল তিনিই বা শৈশব থেকে কৈশোর, যৌবনে, চল্লিশে পৌঁছার আগে কেমন মানুষ ছিলেন? কেমন ছিল তাঁর সামাজিক অবস্থা এবং কী ছিল তার ধর্মবিশ্বাস।

ধর্মীয় বিশ্বাসে সেই যুগ (এবং আজো) যে মূর্খতা, অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও পথভ্রষ্টতায় আচ্ছন্ন ছিল আরব সমাজও তাতে নিমজ্জিত ছিল।

তারা নিজ হাতে গড়া পাথরের মূর্তি লাত, মানাত, উজ্জা ও হুবলের পূজা করতো। এগুলোর সামনে বিচিত্র উপাদেয় ভোগসামগ্রী নিবেদন করতো।

কিন্তু এহেন ধর্মীয় পরিমণ্ডলে বসবাস করেও তিনি কখনো এসব দেব-দেবীর সামনে আনত হননি, প্রসাদ ভক্ষণ করেননি, এমনকি পূজা উপলক্ষে ভোজের আয়োজনেও অংশগ্রহণ করেননি। তাঁর দিল সদা-সর্বদা শেরেক ও সৃষ্টপূজাকে ঘৃণা করতো।

শিশুকালেই, বরং ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেই তিনি পিতাকে হারান, একান্ত অল্প বয়সে মাকে হারান, দাদাকে হারান। একে একে তাঁর মাথার উপর থেকে স্নেহছায়া সরে যেতে থাকে। এই দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় এক আরব শিশুর যতটুকু সেন্হ-মমতা ও আদর-যত্ন পাওয়ার কথা ছিল তা থেকেও তিনি বঞ্চিত হন।

একটু বোধ-বুদ্ধি হলেই মরুভূমির শিশুদের সাথে মেষপাল চরাতে নিয়োজিত হন। যৌবনে পদার্পণ করে কিছুকালের জন্য ব্যবসায় জড়িত হন। এ সামজে তিনি লেখাপড়া থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থেকে যান।

তিনি যে সমাজে বেড়ে ওঠেন, শুরু থেকেই অভ্যাসে ও চরিত্রে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখেন, কখনো মিথ্যা বলেননি। গোটা জাতি তাঁর সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিয়ে তাঁকে আল-আমিন উপাধী দিয়ে ডাকে। তাঁর জবান কঠোতার পরিবর্তে মিষ্টি কথায় ভরপুর।

নিকৃষ্ট চরিত্রের লোকজনের মধ্যে তিনি এতোই পবিত্র যে কেউ কখনো তাঁকে খারাপ কাজ করতে দেখেনি। প্রতিটি বদ স্বভাব ও নিকৃষ্ট আচরণ থেকে মুক্ত-পবিত্র এবং এতাটা নরমদিল যে, মানুষের কষ্ট দেখে তার চোখে পানি এসে যেতো।

তৎকালে আরব জাহিলী পরিবেশে তিনি এতটা বিশিষ্ট দৃষ্টিগোচর হন যেন ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে একটি আলোকবর্তিকা জ্বলজ্বল করছে অথবা পাথরের স্তূপের মধ্যে এক খণ্ড হিরক চকচক করছে। [চলবে]

লেখক: মাওলানা মুহাম্মদ মূসা, তাফসীরকারক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten + 5 =