বাংলাদেশে হাফেজী মাদরাসা: ঐতিহ্য ও আধুনিকায়ন

বাংলাদেশে হাফেজী মাদরাসা: ঐতিহ্য ও আধুনিকায়ন

কুরআনুল কারীমের মাস রমযানুল মুবারাক। মুসলিম জাতি যা পেয়ে গর্বিত তা হলো আল্লাহ তাআলার কালাম ‘কুরআনুল কারীম’।

এ অঞ্চলে কুরআন কেন্দ্রিক যত ধরণের খিদমত হয়েছে তার অন্যতম হলো কুরআনের হিফয বা মুখস্তকরণ।আলহামদুলিল্লাহ!

গ্রামে-গঞ্জে আমাদের পূর্বসূরীরা এ কুরআন মুখস্ত করে কণ্ঠস্ত করেছেন অতি যত্নসহ। এক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। বিষয়টি নিয়ে ইতিহাসবিদদের গবেষণা হওয়া উচিত। গবেষণার নানা উপাদান রয়েছে হাফেজী মাদরাসাকে ঘিরে।

দুই.
একসময় ব্যক্তিগতভাবে মানুষ কুরআন মুখস্ত করতেন। সময়ের ব্যবধানে যখন প্রাতিষ্ঠানিক আকারে মাদরাসা শিক্ষার প্রচলন হলো তখন থেকেই মাদরাসা শিক্ষার অন্যতম অংশ এ হিফয মাদরাসা।

বাংলাদেশে এক সময় মাদরাসা বলতে আলীয়া মাদরাসাকে মানুষ চিনতো। পরে কুরআনের খেদমত আঞ্জাম দেবার প্রতিষ্ঠান হাফেজি মাদরাসাকেই মানুষ ‘মাদরাসা’ বলে চিনতে শুরু করে।

স্বাধীনতা পূর্ব ও পরে এ অঞ্চলে ব্যক্তি সামাজিক উদ্যোগে ব্যাপকভাবে কওমী মাদরাসার প্রতিষ্ঠা হতে থাকে।

আজকের বাংলাদেশে পুরনো যত বড় বড় মাদরাসা আছে প্রায় সব মাদরাসা শুরু হয়েছে হিফয মাদরাসার বারান্দা দিয়ে। প্রথমে হিফযখানা শুরু করে পরে ধীরে ধীরে কিতাবি বিভাগ মাদরাসার উন্নতি হয়েছে।

আজও সকল ছোট-বড় কওমী মাদরাসায় কুরআন মুখস্ত করার স্বতন্ত্র এ বিভাগ ‘হিফযখানা’ বিদ্যমান আছে ও কুরআন মুখস্ত করার আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে।

তিন
বিগত কয়েক বছরে কুরআনের শিক্ষার এ ধারায় ব্যাপক বিপ্লব সাধিত হয়েছে। অবাধ তথ্য সরবরাহের ফলে মানুষ এখন তাদের সম্পর্কে জানতে পারছে। ফলে পরিচালক কর্তৃপক্ষও শোধিত হয়েছে। শিশুদের অমানবিক প্রহার, বাবা-মার কাছে আসতে না দেয়া, কোনো কোনো সময় শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার মত শিশু অপরাধও সংগঠিত হয়েছে অজ্ঞ কিছু লোকের কারণে।

সময়ের ব্যবধানে আজ হিফযখানা বা কুরআন মুখস্ত করার এ ধারা বা প্রতিষ্ঠান অনেক আধুনিক হয়েছে। পূর্বের ব্যবস্থাপনায় অনেক ত্রুটি ছিল। আবাসন, খানা, পড়ানোর পদ্ধতিসহ অনেক কিছুরই শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

কমিটি পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত প্রাইভেট হিফযখানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আধুনিকতায় আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে। উন্নত রুচির সমাহারও চোখে পড়ার মত।

প্রতি রমযানে চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত ছোট বাচ্চাদের কুরআন তিলাওয়াত ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এক সময় গ্রামগঞ্জের ছেলে-মেয়েরা হাফেয হলেও এখন তা শহুরে, প্রতিষ্ঠিত মানুষদের মাঝেও ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। তারা এখন তাদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত করার পাশাপাশি হাফেজ বানিয়ে নিচ্ছেন।

তাদের রুচির দিকে খেয়াল করে রাজধানীসহ জেলা শহরগুলোতেও প্রাইভেট হিফযখানা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ও হয়েছে।

চার
বিগত প্রায় এক যুগে যেমন বিভিন্ন অধ্যায়ে পরিবর্তন হয়েছে তেমনি তিলাওয়াতেও পরিবর্তন হয়েছে আশাব্যঞ্জক। প্রশংসা কুড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপক পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করছে বাংলাদেশের ক্ষুদে,নবীন হাফেজ সাহেবরা।

নিঃসন্দেহে এ অর্জনের পেছনে আমাদের হিফয শিক্ষকদের ব্যাপক কষ্ট ও ভূমিকা রয়েছে। প্রায় একযুগ যাবৎ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হাফেজ সাহেবরা প্রথম স্থান অধিকার করাসহ বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করছে। দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, দেশীয় প্রতিযোগিতা, ভালো মসজিদে তারাবি নামায পড়ানো সুযোগ, বিদেশে চাকরিসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার পথ আবিষ্কার হবার পর ছাত্রদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে উঠেছে।

আগে ইয়াদওয়ালা হাফেজ হবে হবে এমন প্রতিযোগিতা ছিল, এখন তা বদলে গেছে। এখন আগের চেয়ে আরও বেশি ইয়াদসম্পন্ন হাফেজ হচ্ছে কিন্তু দৃষ্টি থাকছে সুযোগ-সুবিধার দিকে।

পাঁচ
সর্বোপরি কুরআন হিফযে এখন পৃথিবীতে বাংলাদেশ সম্ভবত সব থেকে অগ্রগামী। সব থেকে বেশি হাফেযের সংখ্যার গর্বও হয়তো আমাদের এই বাংলাদেশীদের।

এ দেশে আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত অনেক হাফেজ আমরা পেয়েছি। কিন্তু তারা এ দেশের মানুষের, এ দেশের হাফেজি মাদরাসা রেখে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।

তবে এটাও আমি জানি, এদেশে হাফেজ সাহেবদের যথাযথ মূল্যায়ন নেই। কোনো সার্টিফিকেট নেই। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও হাফেজ সাহেবদের তেমন কোনো কদর নেই।

তাই প্রতিবছর সব থেকে মেধাবী,সুন্দর তিলাওয়াতের হাফেজ সাহেবরা বিভিন্ন সুবিধার সুযোগ পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাদের সফলতা কামনা করছি কিন্তু কষ্টগুলো পুষে রাখতে হচ্ছে।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, মাদরাসাতুল মাদীনা, বগুড়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 + 1 =