রোজায় যেভাবে শরীরের বিভিন্ন রোগ নির্মূল হয়

রোজায় যেভাবে শরীরের বিভিন্ন রোগ নির্মূল হয়

ফারসি শব্দ রোজার আরবি অর্থ হচ্ছে সাওম, বহুবচনে সিয়াম। সওম বা সিয়ামের বাংলা অর্থ বিরত থাকা।

ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায়, সুবহে সাদিক থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম বা রোজা।

আল্লাহতালা মানবজাতির দুনিয়ার জীবনযাত্রার শুরু থেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত যতগুলো শরীয়ত বা জীবনবিধান দিয়েছেন এই সিয়াম সাধনা তার প্রত্যেকটিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। সিয়াম সাধনা সকল যুগের মানুষের জন্য ফরজ ছিল।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ কোরআনে বলেন: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যেন তোমরা তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করতে পারো। (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)

মুসলিমরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ‘সিয়াম’। খ্রিস্টানরাও অন্যভাবে রোজা থাকে। খ্রিস্টানরা একে বলে ‘ফাস্টিং’। হিন্দু বা বৌদ্ধরা বলে ‘উপবাস’। বিপ্লবীরা রোজা রাখলে বলা হয় ‘অনশন’। আর, মেডিকেল সাইন্সের কেউ রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ‘অটোফেজি’।

খুব বেশি দিন হয়নি, মেডিকেল সাইন্স ‘অটোফেজি’র সাথে পরিচিত হয়েছে। ২০১৬ সালে নোবেল কমিটি জাপানের ডাক্তার ‘ওশিনরি ওসুমি’-কে অটোফেজি আবিষ্কারের জন্যে পুরস্কার দেয়। এরপর থেকে আধুনিক মানুষেরা ব্যাপকভাবে রোজা রাখতে শুরু করে।

ভার্চুয়াল জগতেও বিচরণ করলে দেখা যাবে আধুনিক সচেতন নারী-পুরুষরা রোজা রাখায় ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠছেন। [তবে তাদের উদ্দেশ্য সওয়াব নয়] শত হলেও, মেডিক্যাল সাইন্স বলে কথা!

অটোফেজি কী?

Autophagy শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ। Auto অর্থ নিজে নিজে, এবং Phagy অর্থ খাওয়া। সুতরাং, অটোফেজি মানে নিজে নিজেকে খাওয়া।

না, মেডিকেল সাইন্স নিজের গোস্ত নিজেকে খেতে বলে না। শরীরের কোষগুলো বাহির থেকে কোনো খাবার না পেয়ে নিজেই যখন নিজের অসুস্থ কোষগুলো খেতে শুরু করে, তখন মেডিকেল সাইন্সের ভাষায় তাকে অটোফেজি বলা হয়।

আরেকটু সহজভাবে বলি-আমাদের ঘরে যেমন ডাস্টবিন বা ময়লার ঝুড়ি থাকে, অথবা আমাদের কম্পিউটারে যেমন recycle bin (ডাস্টবিন) থাকে, তেমনি আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের মাঝেও একটি করে ডাস্টবিন আছে। সারা বছর শরীরের কোষগুলো খুব ব্যস্ত থাকার কারণে, ডাস্টবিন পরিষ্কার করার সময় পায় না। ফলে কোষগুলোতে অনেক আবর্জনা ও ময়লা জমে যায়।

শরীরের কোষগুলো যদি নিয়মিত তাদের ডাস্টবিন পরিষ্কার করতে না পারে, তাহলে কোষগুলো একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে শরীরে বিভিন্ন প্রকারের রোগের উৎপন্ন করে। ক্যান্সার বা ডায়াবেটিসের মত অনেক বড় বড় রোগের শুরু হয় এখান থেকেই।

মানুষ যখন খালি পেটে থাকে, তখন শরীরের কোষগুলো অনেকটা বেকার হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা তো আর আমাদের মত অলস হয়ে বসে থাকে না, তাই প্রতিটি কোষ তার ভিতরের আবর্জনা ও ময়লাগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করে। কোষগুলোর আমাদের মত আবর্জনা ফেলার জায়গা নেই বলে তারা নিজের আবর্জনা নিজেই খেয়ে ফেলে। মেডিকেল সাইন্সে এই পদ্ধতিকে বলা হয় অটোফেজি।

Image may contain: 1 personজাস্ট এ জিনিসটা আবিষ্কার করেই জাপানের ওশিনরি ওসুমি (Yoshinori Ohsumi) ২০১৬ সালে নোবেল পুরস্কারটা নিয়ে গেল। শুনেছি প্রফেসর ওশিনরি নিজেও সপ্তাহে দুটি করে রোজা রাখেন।

যারা স্বাস্থ্যের কথা ভেবে রোজা রাখেন না তাদের প্রতি আমার আফসোস!

কারণ, আমরা (রোজাদাররা) তো প্রতিবছর একমাস রোজা রেখে শরীরের অটোফেজি করে ফেলি। কিন্তু আপনারা (যারা রোজা না রাখেন) কিভাবে শরীরের অটোফেজি করবেন?

লেখক: হাসান মোহাম্মদ মাহমুদুল
গবেষক, নিউরোলোজি বিভাগ, মিয়ে ইউনিভার্সিটি, জাপান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 − seven =