তারাবীহর নামাজ নিয়ে বিতর্ক কেন?

তারাবীহর নামাজ নিয়ে বিতর্ক কেন?

তারাবিহ নামাজে রাকায়াত সংখ্যা নিয়ে ইমাম হাসান আল বান্নার যুগান্তকারী ফতওয়া—

তারাবিহ বিশ রাকাতই ?
না, রাসুল সা. থেকে আট রাকাতই প্রমাণিত ।
হযরত ওমরের রা. সময়ে সাহাবায়ে কেরাম রা. বিশ রাকাত জামায়াতের সাথে আদায় করেছেন ।
তাহলে তারা কি ভুল করেছেন ?

বিশের দলিল প্রমাণ দূর্বল । আমরা আমাদের মুরব্বীদেরকে আট রাকাতই পড়তে দেখেছি ।
আটের দলিল দূর্বল । আমরা তো বিশই পড়ে আসছি ।

কায়রো থেকে দূরে কোন এক গ্রামের মসজিদে এশার নামাযের পর মুসল্লিদের মাঝে আলোচনা চলছে ।

এই আলোচনা ঝগড়া ফাসাদে রূপ নেয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু তার আগেই একজন অপরিচিত সুদর্শন চেহারার আগন্তুক- যাকে দেখলে ঈমান ও আমলের বাস্তব নমুনা বলে মনে হয়- এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতেন । পরদেশীর আওয়াজ এতই গরুগম্ভীর ছিল যে, সবাই তার দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য হয় ।

তিনি উচ্চ আওয়াজে বলতে থাকেন,
হে আমার ভায়েরা !
তারাবিহর ব্যাপারে আপনাদের তর্ক-বিতর্ক আমি দীর্ঘক্ষণ ধরে শুনে আসছি । মসজিদে হট্টগোল ও হৈ চৈ করা মসজিদের মর্যাদার পরিপন্থী । আর আপনাদের তর্ক-বিতর্ক ঝগড়া ও লড়াইয়ে রূপ নিতে যাচ্ছে । সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে তা বিশৃঙ্খলার রূপ পরিগ্রহ করতে যাচ্ছে।

আপনারা যদি আমার দুইটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন তাহলে মনে হয় সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে ।

আপনারা কি এ ব্যাপারে আমাকে কথা বলার অনুমতি দিবেন ? মসজিদের বিভিন্ন দিক থেকে এক সাথে
আওয়াজ ওঠে, জী, জী, বলুন !
সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন ।

আগন্তুক লোকদের দৃষ্টি নিজের দিকে আকৃষ্ট করে বললেন, প্রশ্ন হলো, তারাবিহর শরিয়তী বিধান কি ?
অর্থাৎ এটা ফরজ না নফল (সুন্নত) ?
সমস্বরে সবাই বলে ওঠেন, এটা নফল (সুন্নত)।
খুব ভাল কথা !
আচ্ছা, বলুন তো দেখি, ইসলামে মুসলমানদের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও ভালবাসার ব্যাপারে কি নির্দেশ রয়েছে,
অর্থাৎ এটা ফরজ না নফল ?
লোকজন জবাব দেয়, এটা ফরজ, এটা ফরজ ।

হে আমার ভাইয়েরা !
নফল হলো সেই কাজ, যদি কখনো কোন কারণে তা পরিত্যাগ করা হয়, তাহলে মানুষ গোনাহগার হবে না ।
আর ফরজ হলো ঐ কাজ, যা পরিত্যাগ করলে বা নষ্ট হয়ে গেলে মানুষ গোনাহগার হয়।
আমি কি সঠিক কথা বলেছি ?

সমবেত জনতা এক সাথে জওয়াব দেয়, সম্পূর্ণ সঠিক কথা । আল্লাহর রশিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না’- আল্লাহপাকের এ বাণী আমাদেরকে তার রশি শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেয় এবং বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করে। তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়ার মাধ্যমে মুসলমানদের সাহস ও শক্তি কমে যাবে এবং তাদের প্রভাব বিনষ্ট হয়ে যাবে ।
বলা হয়েছে, ‘তোমরা ঝগড়া বিবাদ করো না। তাহলে তোমরা ব্যর্থ হবে এবং তোমাদের শক্তি ও মানমর্যাদা কমে যাবে।

তারাবিহ হচ্ছে নফল আর মুসলমানদের ঐক্য হচ্ছে ফরজ । এখন আপনারা বলুন, যে ব্যক্তি একটি নফল প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি করে সে ব্যক্তি দ্বীন ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণকামী নাকি শত্রু ?

সমবেত জনতা এক বাক্যে বলে উঠে শত্রু ! শত্রু !
আপনাদের শত্রু আপনাদের ঐক্য চায় নাকি অনৈক্য চায় ? অনৈক্য ।

আপনারা ভেবে দেখুন, যে ব্যক্তি রাসুল সা.এর উম্মতের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করতে চায় সে ব্যক্তিকে হুজুরের সঠিক অনুসারী বলা যাবে নাকি শত্রুর চর বলে
অভিহিত করতে হবে ?

একজন যুবক উঠে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ঐ ব্যক্তি রাসুল আকরামের সা. এর অনুসারী নয়, বরং সে শত্রুর চর ।

যদি কোনো ব্যক্তি এ ধরনের কাজ করে তাহলে আপনাদের দায়িত্ব তাকে প্রতিহত করা নাকি তার সাথে সহযোগিতা করা ? আমরা তাকে প্রতিহত করবো । আমাদের কাছে আট রাকাত বা বিশ রাকাতের সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত নাকি মুসলমানদের ঐক্য ?ঐক্য, ঐক্য ।

হে আমার ভাইয়েরা !
আপনারা যদি ঐক্য চান তাহলে আপনাদের ত্যাগ ও কোরবানী করতে হবে। আপনারা কি এ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ? আমরা সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ।
কোরবানী শুধু এতটুকুই করতে হবে যে, আপনারা যে ইমাম কিংবা নিজের বিশ্লেষণের প্রতি সন্তুষ্টি ও আস্থা সৃষ্টি হবে আপনি সেটাই কার্যকর করবেন এবং অন্যদেরকে কোরআন ও সুন্নাহর দলিল দ্বারা বোঝানোর চেষ্টা করবেন । কিন্তু অন্যকেও তার নিজস্ব পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী চলতে দিতে হবে।
কেননা, প্রত্যেক মুসলমানই নিজের বিশ্লেষণের স্বপক্ষে কোরআন হাদীস থেকেই দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকেন।

কেউই তওরাত বা ইঞ্জিল থেকে দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করেন না। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে ভিন্নতা খুবই স্বাভাবিক বিষয়।

মাসআলা মাসায়েলের শাখা প্রশাখায় যিনি যেটাকে উত্তম মনে করবেন তিনি সেটাই আমল করবেন। দ্বীনের মৌলিক বিষয় ও সর্বসম্মত বিষয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করে যাবেন ।

আপনাদের শত্রু ইংরেজ, ইহুদী, বৌদ্ধ ও মুশ‌রিক হিন্দুরা আপনাদের বুকে গুলি চালানোর সময় পার্থক্য করবে না যে, কে শাফেয়ী আর কে হানাফী ? কে আট রাকাত তারাবিহ পড়ে, আর কে বিশ রাকাত তারাবিহ পড়ে ?

তাদের দৃষ্টিতে কালেমা পাঠ করা সব মুসলমানই শত্রু।

তাদের সাফল্য এটাই যে, তারা আপনাদেরকে পরস্পরের সাথে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত রাখতে পেরেছে।
এ জন্য আজ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, শাখা প্রশাখার ঝগড়া পরিহার করে কুফরী ও জালেম শক্তির বিরুদ্ধে
আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাওয়া এবং নিজদেরকে খাঁটি মুসলমান বানানো ।

মুসাফিরের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর লোকজন উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধার সঙ্গে তার সাথে হাত মিলাতে থাকে। গ্রামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি- যার পোশাক পরিচ্ছদ ও চেহারা দেখে বিত্তশালী ও সম্মানিত ব্যক্তি বলে মনে হয়- তিনি সামনে এগিয়ে এসে মুসাফিরকে জিজ্ঞেস করেন, আমি আপনার কথায় খুবই মুগ্ধ হয়েছি । আপনি অনুগ্রহপূর্বক যদি আপনার পরিচয় দিতেন তাহলে খুবই ভালো হতো ।

আমার নাম হাসানুল বান্না, আমি কায়রোতে থাকি। আগন্তুক তার কাছে দাঁড়ানো সঙ্গীর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আর ইনি আমার বন্ধু আহমদ সুকরী, ইখওয়ানুল মুসলেমুনের জেনারেল সেক্রেটারি ।

বিত্তবান ব্যক্তি বলেন, আমি আপনার নাম শুনেছি এবং আজ দেখার সুযোগ হলো । আপনি এখানে কার বাড়িতে অতিথি হয়েছেন ? আমরা আল্লাহর অতিথি । ইখওয়ানুল মুসলেমুনের দাওয়াত মানুষের কাছে
পৌঁছানোর জন্য আল্লাহর পথে বেরিয়েছি।
আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহীহ বুঝ দান করুন ।
আমীন।
(শহীদ হাসান অাল বান্নার ডা‌য়েরী থে‌কে সংগৃহীত।)

[পাঠকের লেখা একান্তই তার ব্যক্তিগত লেখা। এ লেখার কোন বিষয় আলেম-উলামা ডটকমের মতামত নয়। তাই পাঠকের লেখার কোন মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 3 =