পবিত্র কোরআন নাজিলের মাস রমজান

পবিত্র কোরআন নাজিলের মাস রমজান

কোরআন হলো রমজানের নিগূঢ় তত্ত্ব; রমজানের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্কও সুগভীর। রমজান মাস এমন যে, তাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে; মানুষের জন্য পথপ্রদর্শকরূপে ও হিদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনা ও সত্যাসত্যের পার্থক্য নির্ণয়কারী হিসেবে। (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৫)।

রমজানের পঁাচটি সুন্নত—(১) সাহরি খাওয়া, (২) ইফতার করা, (৩) তারাবির নামাজ পড়া, (৪) কোরআন মজিদ তিলাওয়াত করা, (৫) ইতিকাফ করা। এই পঁাচটি সুন্নতের দুটিই হলো প্রাকৃতিক প্রয়োজন; যা মানুষ বাধ্য হয়ে করে থাকে। রোজা রাখার শক্তি–সামর্থ্য অর্জনের জন্য সাহরি খাওয়া এবং রোজার ক্লান্তি ও ক্ষুধা নিবারণের জন্য ইফতার করা। মূলত শেষোক্ত তিনটিই হলো রমজানের মূল ইবাদত বা মৌলিক উদ্দেশ্য। আর এই তিনটির সঙ্গেই রয়েছে কোরআনের একান্ত সম্পর্ক। যথা: রমজানের তৃতীয় সুন্নত তারাবির নামাজ, এতে কোরআন তিলাওয়াত করা হয়, যা নামাজের ফরজ ও ওয়াজিব রুকন এবং খতম তারাবিতে পূর্ণ কোরআন মজিদ খতম করা হয়, যা সুন্নত। রমজানের চতুর্থ সুন্নত কোরআন তিলাওয়াত। সাহাবায়ে কিরাম প্রায় সারা বছর প্রতি মাসের প্রতি সপ্তাহে পূর্ণ কোরআন শরিফ একবার তিলাওয়াত করতেন। প্রতি সাত দিনে এক খতম পড়তেন বলেই কোরআন মজিদ সাত মঞ্জিলে বিভক্ত হয়েছে। তঁারা রমজান মাসে আরও বেশি বেশি তিলাওয়াত করতেন।

হজরত রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রমজানে হজরত জিবরাইল (আ.)–কে অবতীর্ণ পূর্ণ কোরআন একবার শোনাতেন এবং হজরত জিবরাইল (আ.)ও নবী কিরম (সা.)–কে অবতীর্ণ পূর্ণ কোরআন একবার শোনাতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের শেষ রমজানে দশম হিজরির রমজান মাসে মহানবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত জিবরাইল (আ.)–কে পূর্ণ কোরআন মজিদ দুবার শোনান এবং হজরত জিবরাইল (আ.)–ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পূর্ণ কোরআন শরিফ দুবার শোনান। এতে বোঝা গেল রমজান শুধু কোরআন নাজিলের মাস নয়; বরং রমজান মাস হলো কোরআন শিক্ষণ প্রশিক্ষণ, কোরআন পঠন পাঠন ও কোরআন চর্চার মাস এবং সর্বোপরি রমজান মাস হলো জীবনের সর্বক্ষেত্রে কোরআন অনুশীলন ও বাস্তবায়নের মাস।

রমজানের চতুর্থ সুন্নত হলো ইতিকাফ, যা মূলত আল্লাহর সেঙ্গ নির্জনবাস বা গোপন অবস্থান। যার উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর সঙ্গে সঙ্গোপনে বিশেষ সান্নিধ্য অর্জন ও একান্ত আলাপচারিতা। কোরআন হলো কালামুল্লাহ বা আল্লাহর বাণী। কোরআন তিলাওয়াত হলো আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা। তাই ইতিকাফের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো কোরআন তিলাওয়াত।

এ ছাড়া ইসলামি শরিয়তে ইমানের পরই হলো নামাজ, নামাজের উদ্দেশ্য হলো জিকির বা আল্লাহর স্মরণ। কোরআন মজিদে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, আমার স্মরণোদ্দেশ্যে সালাত কায়েম করো। (সুরা-২০ তোহা, আয়াত: ১৪)। তাই নামাজের উদ্দেশ্যও হলো আল্লাহর জিকির বা প্রভুর স্মরণ। কোরআন মজিদের ৭২টি নামের ৩টিই হলো জিকির বা স্মরণ। যথা: (১) জিকরুল হাকিম বা কৌশলগত স্মরণ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ৫৮); (২) আজ িজকর বা মহাস্মরণ (সুরা-৪১ হা–মীম সাজদা, আয়াত: ৪১); (৩) তাজকিরা বা স্মারক (সুরা-৮০ আবাসা, আয়াত: ১১)। রমজান মাসে তারাবিহ তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইলসহ বেশি বেশি নামাজ পড়া হয়, আর নামাজে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা হয়, এতে করে রমজানের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক ও রমজান মাসে কোরআন তিলাওয়াত, অধ্যয়ন ও আমলের অনুশীলন ও চর্চার সূত্র ও সুনিবিড়তা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়।

সম্মানিত শবে কদর ও মহিমান্বিত কোরআন

ইসলামে স্বীকৃত বরকতময় ও মহিমান্বিত যেসব দিবস রজনী রয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শবে কদর বা লাইলাতুল কদর। কদরের এক অর্থ মাহাÍত্ম্য ও সম্মান। অন্যান্য রাতের তুলনায় এ রাত মহিমান্বিত হওয়ার কারণে এটাকে লাইলাতুল কদর তথা মহিমান্বিত রাত বলা হয়।

আবু বকর ওয়াররাক (রহ.) বলেন, এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলার কারণ হচ্ছে, এ রাতে আল্লাহ যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন সেটা মহিমান্বিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব এবং যে নবীর ওপর অবতীর্ণ, তিনিও মহিমান্বিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, আর যে উম্মতের জন্য অবতীর্ণ করেছেন, তারা মহিমান্বিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত। সর্বোপরি আমল না করার কারণে এর পূর্বে যার সম্মান ও মূল্য মহিমান্বিত থাকে না, সেও এ রাতে তওবা ইস্তিগফার ও ইবাদত–বন্দেগির মাধ্যমে মহিমান্বিত হয়ে যায়।

কোরআন মজিদ শবে কদরে অবতীর্ণ হয়

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি কদরের রজনীতে কোরআন নাজিল করেছি। আপনি জানেন কি? কদরের রজনী কী? কদরের রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম! সে রাতে ফেরেশতাগণ অবতীর্ণ হন, জিবরাইল (আ.) সহ; তঁাদের রবের নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে সব বিষয়ে শান্তির ফয়সালা নিয়ে; তা উষার উদয় পর্যন্ত। (সুরা-৯৭ কদর, আয়াত: ১-৫)।ুরা কদরের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় আমি কদর রাতে কোরআন নাজিল করেছি।’ এ আয়াত থেকে পরিষ্কার জানা যায়, শবে কদরে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর হজরত জিবরাইল (আ.) ধীরে ধীরে তেইশ বছরে তা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে পৌঁছাতে থাকেন। এ কথাও বলা যেতে পারে, এ রাতে কয়েকটি আয়াত অবতরণের মাধ্যমে কোরআন অবতরণের ধারাবাহিকতার সূচনা হয়। এরপর অবশিষ্ট কোরআন পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হয়।

লেখক: হাফেজ মাওলানা মিজানুর রহমান: সিনিয়র পেশ ইমাম, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, ঢাকা।

[প্রথম আলোয় ২৬ মে ২০১৭ প্রকাশিত]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − six =