বিশ্বনবীর (স) রাষ্ট্রদূত দাহ্ইয়াহ কালবি

বিশ্বনবীর (স) রাষ্ট্রদূত দাহ্ইয়াহ কালবি

নবীজি (সা.)-এর রাষ্ট্রদূত হজরত দাহ্ইয়াহ্ ওয়াহি আল-কালবি (রা.), হুজুর পাক (সা.)-এর অত্যন্ত অনুগত এবং সুদর্শন একজন সাহাবি, যার স্বরূপ ধরে স্বয়ং জিবরাঈল (আ.) আসতেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

একটি ঘটনা একই সঙ্গে তাঁর কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরবে। একদিন মসজিদে নববীতে হজরত জিবরাঈল (আ.) হজরত দাহ্ইয়াহ কালবি (রা.)-এর রূপ ধারণ করে এলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। শিশু হজরত হাসান (রা.) এবং হোসাইন (রা.) খেলছিলেন মসজিদের চত্বরে, দু’জনেই দৌড়ে গিয়ে ‘দৃশ্যত’ হজরত দাহ্ইয়াহ কালবি (রা.)-এর জোব্বার পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আজ আমাদের জন্য কী এনেছেন?’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলে উঠলেন, ‘হে জিবরাঈল! আমার নাতিদের অভদ্র ভাববেন না যেন। তারা ভেবেছে আপনি দাহ্ইয়াহ কালবি। সে যখনই আসে তাদের জন্য কোনো না কোনো উপহার নিয়ে আসে এবং তারা সেগুলো গ্রহণ করে। সে তাদের এতে অভ্যস্ত বানিয়ে ফেলেছে।’ জিবরাঈল (আ.) অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন এই ভেবে যে স্বয়ং বেহেশতের সরদার, হোক না বুঝেই; কিন্তু তার কাছে কিছু চেয়েছেন। তিনি আল্লাহর অনুমতি নিয়ে বেহেশতের ফল দিলেন তাদের হাতে। নবীজি (সা.) তাঁর প্রিয় নাতিদের বললেন ‘যাও, বাড়িতে গিয়ে সবাইকে নিয়ে খাও, কারণ এগুলো জান্নাতের ফল।’

কিন্তু এমন একজন ব্যক্তিত্বকে নিয়ে পাওয়া তথ্য প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। পাওয়া তথ্যমতে, তিনি মূলত ছিলেন দক্ষিণ আরবের অধিবাসী, পরবর্তী সময়ে ‘কালব’ গোত্রের সদস্য হিসেবে বসবাস করেন দামেস্কের আশপাশের কোনো এলাকায়। মদিনা মুনাওয়ারার তরুণ মুসলিমদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

ইসলাম গ্রহণের আগেই হজরত দাহ্ইয়াহ কালবি (রা.) নবীজির (সা.) মনে বিশেষ জায়গা দখল করে নিয়েছিলেন। নবীজি (সা.)-এর কাছে যখনই আসতেন প্রত্যেকবার উপহার নিয়ে আসতেন আর ততবারই নবীজি (সা.) বলতেন, ‘যদি সত্যিই তুমি আমাকে খুশি করতে চাও তবে ইসলাম গ্রহণ কর এবং নিজেকে আগুন থেকে বাঁচাও।’ অবশ্য সব সাহাবিই যে তাকে পছন্দ করতেন তা নয়; কারণ অতীত জীবনে তিনি জুলুম করেছেন বলে সাহাবিরা জানতেন; কিন্তু নবীজি (সা.) চাইতেন না তাকে কেউই নেতিবাচক কিছু বলুক কিংবা ব্যবহারে বোঝাক। অবশেষে বদর যুদ্ধের পর হজরত দাহ্ইয়াহ কালবি (রা.) নবীজির (সা.) কাছে এলেন মুসলিম হওয়ার বাসনা নিয়ে। তার আসার সঙ্গে সঙ্গে নবীজি (সা.) খুবই খুশি হয়ে তাকে সমাদর জানালেন, নিজের পরিহিত পবিত্র জোব্বা বিছিয়ে দিয়ে এবং দাহ্ইয়াহ কালবিকে (রা.) বসতে বললেন। নবীপ্রেমিক দাহ্ইয়াহ কালবি (রা.) পবিত্র জোব্বাখানা তুলে মাথায় রাখলেন এবং চুমু খেলেন। তিনি বলে উঠলেন, ‘না, আমি তো এভাবে বসতে পারি না। যদি আপনি চান এখানেই আমার মাথা কেটে ফেলুন, আমাকে প্রহার করুন কিংবা আমাকে অভিশাপ দিন।’ এরপর থেকেই তিনি সাহাবি হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন।

মুসলিম হওয়ার পর থেকে সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় নবীজির (সা.) পাশে থেকেছেন তিনি। সেনাদলের একটি অংশের কমান্ডার ছিলেন তিনি। তবে ইতিহাসে বেশি পরিচিত ঘটনাটি হল তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর সময়টাকে যথাযোগ্যভাবে কাজে লাগানোর জন্য নবীজি (সা.) সিদ্ধান্ত নিলেন পৃথিবীর প্রধান প্রধান রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে তাঁর দূত পাঠাবেন। অবশ্যই প্রয়োজন ছিল জ্ঞানী, ব্যক্তিত্ববান এবং আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তির যিনি ভিনদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের সামনে রাসূলুল্লাহকে (সা.) আল্লাহর রাসূল ঘোষণা করবেন, ব্যাখ্যা করবেন তাঁর প্রদত্ত ‘মেসেজ’। রাসূলুল্লাহ (সা.) চিঠি লিখলেন, নিজ হাতে সিল তৈরি করলেন যেখানে লেখা ছিল ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। হুজুর পাক (সা.)-এর ইচ্ছানুযায়ী ইসলামের ইতিহাসের প্রথম তিন রাষ্ট্রদূতের একজন হওয়ার সম্মান পেলেন হজরত দাহ্ইয়াহ আল কালবি (রা.), যার গন্তব্য ছিল বাইজেন্টাইন; হজরত আবদুল্লাহ বিন-হুদায়ফাহ (রা.), যিনি ঘোড়া ছুটিয়েছেন পারস্যের পথে আর হজরত হাতিপ বিন আবু বালতা (রা.), যিনি গিয়েছিলেন মিসরে। হিজরি ৭ম বর্ষের মহররম মাসে পবিত্র চিঠিখানি নিয়ে হজরত দাহ্ইয়াহ কালবি (রা.) রওনা হয়েছিলেন বাইজেন্টাইন রাজ্যের সম্রাট হিরাক্লিয়াসের উদ্দেশে, যিনি ছিলেন খ্রিস্টান। চিঠি প্রদানের পর হজরত দাহ্ইয়াহ্ আল কালবি (রা.) রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে জিজ্ঞেস করলেন, মুসা (আ.), ঈসা (আ.) কি ইবাদত করতেন? তিনি উত্তর করলেন, হ্যাঁ। ‘তা হলে আমিও আপনাকে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস আনার দাওয়াত দিচ্ছি যার ইবাদত করতেন মুসা (আ.), ঈসা (আ.)’ অনুরোধের সুরে বললেন নববী দূত কালবি। এ দাওয়াতে তিনি সফলও হয়েছিলেন। হিরাক্লিয়াস বিশ্বাস করেছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর রাসূল যার আগমনের সুখবর তাদের ধর্মগ্রন্থে দেয়া হয়েছে। হজরত দাহ্ইয়াহ আল কালবি (রা.)-এর শাণিত যুক্তি বক্তব্যের কারণে ব্যর্থ হয়ে যায় সে সময়ের অন্যতম কোরেশ অধিপতি আবু সুফিয়ানের প্রভাব, যিনি উপস্থিত ছিলেন রোমান সম্রাটের সেই রাজসভায়। অবশ্য হিরাক্লিয়াস মুসলিম হননি সিংহাসন হারানোর ভয়ে। কারণ তার প্রজারা ছিল খ্রিস্টান এবং তিনি নিশ্চিত ছিলেন, এই দাওয়াত গ্রহণ করলে বিদ্রোহের মুখে পড়বেন তিনি। অনেক উপঢৌকন আর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে লেখা একটি চিঠি দিয়ে হজরত দাহ্ইয়াহ আল কালবিকে (রা.) বিদায় জানানো হয়েছিল; কিন্তু মদিনার পথে আসার সময় হিসমা নামক স্থানে তিনি দস্যুদের কবলে পড়েন। চিঠিটি ছাড়া তার সঙ্গে আনা সবকিছু নিয়ে পালিয়ে যায় দস্যুরা। মদিনায় পৌঁছেই তিনি রাসূলুল্লাহর (সা.) সঙ্গে দেখা করেন এবং রোমান সম্রাটের চিঠিটি দিয়ে সবিস্তারে সব ঘটনা বর্ণনা করেন। নবীজি (সা.) চিঠিটি পড়ে বললেন, ‘সে আর কিছুদিন মাত্র সিংহাসনে থাকবে। যতদিন পর্যন্ত আমার চিঠিটি তাদের সঙ্গে থাকবে, তাদের সাম্রাজ্য চলতে থাকবে।’ সত্যিই, হিরাক্লিয়াসকে লেখা সিল্কের কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখা চিঠিটি যেদিন হারিয়ে গেল, তারাও তাদের রাজ্য হারাল। সেই সঙ্গে নবীজি (সা.) সেই দস্যু দলকে শাস্তি দিতে হজরত জাইদ-বিন-হারিথ (রা.)-এর নেতৃত্বে সেনাদল পাঠালেন যারা তাঁর রাষ্ট্রদূতের ওপর হামলা করেছিল। দস্যুনেতা এবং তার ছেলেসহ অনেকেই প্রাণ হারায় সে যুদ্ধে।

আরও একটি ঘটনা আগ্রহ জাগায়। হজরত আবদুল্লা ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আলী (রা.) প্রতি সকালের মতো এক সকালে মসজিদে নববীতে নবীজির (সা.) সঙ্গে দেখা করতে এসে দেখেন, আঙিনায় নবীজি (সা.) হজরত দাহ্ইয়াহ আল কালবি (রা.)-এর কোলে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছেন। সালাম বিনিময় হলে ইমাম আলী (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘নবীজি (সা.) কেমন আছেন?’ হজরত দাহ্ইয়াহ কালবি (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূলের ভাই! তিনি ভালো আছেন।’ ইমাম আলি (রা.) বললেন, ‘আল্লাহ আপনাকে পুরস্কৃত করুন।’ হজরত দাহ্ইয়াহ (রা.) বললেন, ‘আমি আপনাকে পছন্দ করি এবং আমি আপনার জন্য একটি উপঢৌকন এনেছি। আপনি হলেন বিশ্বাসীদের নেতা এবং সেই জন যে আপনার অনুসারীদের বেহেশতে নিয়ে যাবে। মহানবীর (সা.) পর আপনিই হলেন সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি। শেষ বিচারের দিন আপনি হবেন বাহক। আপনি এবং আপনার দলই নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে প্রথমে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আপনার অনুগতরাই পাবে মুক্তি। তারা নিষ্কৃতি পাবে না যারা আপনার বেলায়েত অস্বীকার করবে। যে আপনাকে ভালোবাসবে আর ভালোবাসবে মুহাম্মদকে (সা.), যে আপনার প্রতি ঘৃণা পোষণ করে সে নবীজি (সা.)-এর শত্রু, তাই আপনারও শত্রু এবং সে রাসূলের (সা.) সুপারিশ থেকে বঞ্চিত হবে। আমার কাছে আসুন। আপনি এর যোগ্য’- এই বলে তিনি হুজুর পাক (সা.) এর পবিত্র শির মোবারক হজরত আলী (রা.)-এর কোলে দিলেন, তারপর চলে গেলেন। নবীজি (সা.)-এর ঘুম ভাঙলে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে? ইমাম আলী (রা.) বললেন, দাহইয়াহ কালবি (রা.-এর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি বললেন, ‘না, তিনি ছিলেন জিবরাঈল (আ.) এবং তিনি তোমাকে সেই উপাধিতেই ডেকেছেন যা পরম করুণাময় আল্লাহ তোমাকে দিয়েছেন। দয়াবান আল্লাহই তোমার বিশ্বাসীদের অন্তরের অভ্যন্তরে তোমার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করেন এবং অবিশ্বাসীদের ভেতরে দেন ভয়।’

পরবর্তী সময়ে হজরত দাহ্ইয়াহ আল কালবিকে (রা.) নিয়ে পাওয়া তথ্য খুব কম। যাও-বা জানা যায় তা নিয়েও আছে মতবিরোধ। পাওয়া সূত্র থেকে ধারণা করা হয়, তিনি সিরিয়া অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন, ইয়ারমুক যুদ্ধে অন্যতম সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সিরিয়া বিজয়ের পর দামেস্কে ‘মিজ্জা’ নামক এলাকা প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য তার ইন্তেকালের সময়কালটা অনিশ্চিত। ধারণা করা হয়, তিনি আমির মুয়াবিয়ার শাসনকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন; যার অর্থ দাঁড়ায় এ নবীপ্রেমিক ৫০ হিজরির সময়কালে ইন্তেকাল করেছেন। তার মাজার শরিফ কোথায় তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না, কারণ, উইকিপিডিয়া ছবিসহ প্রমাণ দিচ্ছে, তার মাজার বর্তমান ইসরাইলে অবস্থিত। অনান্য সূত্রগুলোও ছবি সহকারে বলছে, তিনি ইন্তেকাল করেছেন দামেস্কে এবং তার মাজার শরিফও সেখানেই অবস্থিত।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × one =