হাফেজদের তারাবীর প্রস্তুতি

হাফেজদের তারাবীর প্রস্তুতি
হাফেজ শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ সংরক্ষক বা সংরক্ষণকারী। স্বাভাবিকভাবে হাফেজ বলা হয় যিনি পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা মুখস্থ করেছেন।
 তারাবি শব্দটিও আরবি। এর অর্থ আরাম করা। রমজান মাসে এশার ৪ রাকাত ফরজ ও ২ রাকাত সুন্নাতের পর সালাতুল বেতেরের আগে যে ২০ রাকাত নামাজ পড়া হয় তাকেই তারাবি বলে। শরিয়তের ভাষায় তারাবির নামাজ সুন্নাতে ‘মুয়াক্কাদা’। ২ রাকাত বা ৪ রাকাত করে জামাত অথবা জামাত ছাড়া এ নামাজ আদায় করা যায়। তবে ২ রাকাত করে পড়া এবং ৪ রাকাত পর খানিকটা সময় বসে তাসবিহ-তাহলিল পাঠ করার কথাও বর্ণিত হয়েছে হাদিসের কিতাবে।

উম্মাতে মুসলিমার দোরগোড়ায় আবার হাজির হয়েছে রহমত, বরকত ও নাজাতের মাস রমজান। রমজানকে আরও মহিমান্বিত করতে এ মাসেই অবতীর্ণ করা হয়েছে মহাগ্রন্থ আল কোরআন। লওহে মাহফুজে যার একপ্রান্ত, অপরপ্রান্ত হাফেজে কোরআনের বক্ষে। বন্ধন ও আত্মীয়তার এ গ্রন্থি চির শাশ্বত চির অটুট। তাই পাক কোরআনের হাফেজ, পাঠক, গবেষক ও শ্রোতাদের সঙ্গে মহান মালিকের সম্পর্ক হয়ে ওঠে চিরন্তন। এ উম্মাহর এটাই শ্রেষ্ঠ সম্পদ, শ্রেষ্ঠ পরিচয়, শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্যের উম্মাহ স্বমহিমায় টিকে থাকবে ততদিন, যতদিন তাদের হৃদয়ে সংরক্ষিত থাকবে পাক কালাম। সুতরাং কালামে পাকের সংরক্ষণ এবং হাফেজে কোরআনের অধিকার প্রতিষ্ঠা সমাজ-রাষ্ট্রসহ সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। তারাবি উপলক্ষে ক’জন দেশসেরা হাফেজে কোরআনের সুখ-দুঃখসহ তারাবির খুঁটিনাটি উপস্থাপন করছি পাঠকদের জন্য।

হাফেজ আহমাদুর রহমান : সুনামগঞ্জ। ৮ বছর বয়সে ঘরে বসেই পিতার কাছে হিফজ সম্পন্ন করেছেন। এরপর দেশের সীমানা পেরিয়ে স্বদেশের পতাকা তুলে ধরেছেন বিশ্বদরবারে। ২০১০ সালে সৌদিতে অনুষ্ঠিত ৮৫টি রাষ্ট্রের সম্মিলিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় ২য় স্থান অধিকার করেছেন। কথা হয় তার সঙ্গে।

প্রশ্ন : এ বছর আপনি কোথায় তারাবি পড়াবেন?

হাফেজ আহমাদুর রহমান : এ বছর আমি তারাবি পড়াব উত্তরার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন জামে মসজিদে।

প্রশ্ন : রমজানে সাধারণ মানুষের মনে কোরআন পাঠের এ আবহটা সারা বছর ধরে রাখার জন্য কী করা যায়?

হাফেজ আহমাদুর রহমান : এ ব্যাপারে হাফেজরা মানুষকে বেশি বেশি কোরআন পাঠের উপকারিতা বলতে পারেন।

প্রশ্ন : যারা এ বছর নতুন তারাবি পড়াবেন তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

হাফেজ আহমাদুর রহমান : তারাবি হল সাধারণ নামাজের মতো। এখানে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; ভালো তারাবি পড়ানোর জন্য কেবল রমজানকেন্দ্রিক চর্চায়ই যথেষ্ট নয়। ভালো তারাবি পড়ার জন্য চর্চা করতে হয় হরহামেশা।

প্রশ্ন : যারা তারাবি পড়ানোর সুযোগ পাননি তাদের কোরআন শরিফ ইয়াদের (মুখস্থ) থাকার ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

হাফেজ আহমাদুর রহমান : যদি তারাবি পড়ানোর কোনো সুযোগ পাওয়া না যায়, আর যদি সে ইয়াদের জন্য তারাবিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় তা হলে নিজ বাসায় পিতা-মাতা-ভাইবোনদের নিয়ে একটি জামাত করা যেতে পারে। এতে তার ইয়াদের সমস্যা থাকবে না।

হাফেজ মুহিববুল্লাহ : ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ১২ বছর বয়সে পিতা মাওলানা ইসহাকের কাছে শেষ সবক শোনানোর মধ্য দিয়ে হিফজ সম্পন্ন করেছেন। ইতিমধ্যে তার সুললিত কণ্ঠে কোরআনের মধুময় সুর ছড়িয়ে পড়ছে মাদ্রাসা সীমানা ছাড়িয়ে দেশের আনাচে-কানাচে। বর্তমানে তিনি চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসায় তাকমিল জামাতে (মাস্টার্স) অধ্যয়নরত।

প্রশ্ন : আপনি কেমন আছেন হাফেজ সাহেব?

হাফেজ মুহিববুল্লাহ : আল্লাহ পাক অনেক ভালো রেখেছেন আমায়।

প্রশ্ন : আপনি কোথায় তারাবি পড়াবেন?

হাফেজ মুহিববুল্লাহ : আমি তারাবি পড়াই খিলগাঁও রিয়াজবাগ জামে মসজিদে। এখানে আমি ৮ বছর ধরে তারাবি পড়াচ্ছি।

প্রশ্ন : রমজানের তারাবিতে যে তেলাওয়াত করা হয়, যাতে করে মুসল্লিরা তার মর্মার্থ বুঝতে পারে এ ব্যাপারে মসজিদগুলোতে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।

হাফেজ মুহিববুল্লাহ : খুব সুন্দর একটা প্রশ্ন। এটা অলরেডি আমরা আমাদের মসজিদে শুরু করেছি। সিরিয়াল অনুযায়ী যিনি নামাজ আগে পড়ান তিনি নামাজের ১০ মিনিট আগে ওই দিনের তেলাওয়াতের আয়াতগুলোর সারনির্যাস শুনিয়ে দেন। তারাবির আগে ও পরে ১০ মিনিট সময় নিয়ে হাফেজদের মাধ্যমে তারাবির সঙ্গে সঙ্গে কোরআনের মর্মার্থ বোঝার প্রয়োজনটাও পূরণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে হাফেজ আলেম হলে ভালো হয়।

হাফেজ তাওহিদুল ইসলাম : জর্ডানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। তিনি কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেছেন। ২০১৩ সালে হিফজ সম্পন্ন করেন। এ বছর তিনি জীবনের ৮ম তারাবি পড়াবেন।

প্রশ্ন : একজন হাফেজকে খুব ভালো করে তারাবি পড়ানোর জন্য কেমন প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন?

হাফেজ তাওহিদুল ইসলাম : খুব ভালো করে নামাজ পড়ানোর জন্য সারা বছর তাকে নিয়মিত তেলাওয়াত করতে হবে। নামাজ পড়ানোর সময় নিজেকে সতর্ক রাখতে হবে। ভয় করলে চলবে না। এ ছাড়া এটা যেহেতু ইবাদত, তাই আল্লাহতায়ালার কাছে বেশি বেশি কবুলিয়াতের জন্য দোয়া করতে হবে।

প্রশ্ন : প্রতিদিনের তারাবিতে তেলাওয়াতকৃত আয়াতের সাবলিল তরজমা মুসল্লিদের বুঝিয়ে দেয়ার জন্য কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে?

হাফেজ তাওহিদুল ইসলাম : তেলাওয়াতকৃত আয়াতগুলোর পূর্ণাঙ্গ তরজমা বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। তবে যাতে করে মুসল্লিরা তার সারনির্যাসটা জানতে পারে, এ ব্যাপারে দুটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। ১. যারা সময় দিতে পারবে না এবং বাংলা পড়তে সক্ষম তাদের আগামী দিন কোন্ পারার কত আয়াত পড়ানো হবে তা জানিয়ে দেয়া যেতে পারে। যাতে করে তারা বাসায় বসে বাংলা পড়ে মোটামুটি তার মর্মার্থ জেনে নিতে পারে। ২. যারা সময় দিতে পারবেন তাদের জন্য মসজিদে নামাজের ১০ মিনিট আগে ওই দিনের তেলাওয়াতের আয়াতগুলোর সারনির্যাস বিশেষ তাফসির বলে দেয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন : আপনার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা বলুন?

হাফেজ তাওহিদুল ইসলাম : আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হল কোরআন নিয়ে। যেদিন আমি ইফার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশে ১ম স্থান অধিকার করেছি এবং জর্ডানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি সেদিন আমার বন্ধুরা আনন্দে আমাকে মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। এটাই আমার জীবনে সবচেয়ে আনন্দের ও স্মরণীয় ঘটনা।

হাফেজ নাজমুস সাকিব : ময়মনসিংহের অজপাড়াগাঁয়ের ছেলে। মাত্র ৯ বছর বয়সে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন। কোরআনপ্রেমী বাবা-মার আগ্রহই তাকে পাইয়ে দিয়েছে কোরআনের মতো মহাদৌলত। ২০১৩ সালে সৌদি আরবের মক্কায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। এতে বিশ্বের ৭০টি রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করেছিল। সৌদির ধর্মমন্ত্রী ও মক্কা শরিফের ইমাম আবদুর রহমান সুদাইসি তাকে সনদ ও ৮০ হাজার রিয়াল প্রদান করেন।

প্রশ্ন : আপনি কার কাছে হাফেজ হয়েছেন?

হাফেজ নাজমুস সাকিব : আমি হাফেজ হয়েছি, হাফেজ ক্বারি নাজমুল হাসান হুজুরের কাছে।

প্রশ্ন : আপনি এ বছর কোথায় তারাবি পড়াবেন?

হাফেজ নাজমুস সাকিব : চিটাগাং।

প্রশ্ন : এর আগে কোথায় পড়িয়েছেন?

হাফেজ নাজমুস সাকিব : লন্ডনে।

প্রশ্ন : সেখানে আপনার কেমন লেগেছে?

হাফেজ নাজমুস সাকিব : অনেক ভালো। আমাকে সবাই আদর করত। তারা এত বেশি ধার্মিক না হলেও কোরআনে হাফেজদের প্রতি তাদের প্রকৃত সম্মানবোধ দেখেছি। যেমনটা বাংলাদেশের অনেক মসজিদে দেখা যায় না।

প্রশ্ন : আপনি হাফেজ হওয়ার পেছনে কার ভূমিকা বেশি ছিল।

হাফেজ নাজমুস সাকিব : বাবা-মা দু’জনের স্বপ্ন ছিল আমাকে কোরআনের হাফেজ বানাবেন। আর হুজুরদের প্রচেষ্টায় আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছেন।

একেকজন হাফেজে কোরআন এ দেশের একেকটি প্রতিভা, একেকটি তারকা। এমন আলোকিত জীবন্ত তারকার অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু আফসোস আমাদের মাতৃভূমি এসব কৃতী সন্তানকে মূল্যায়ন করতে অক্ষম। একজন হাফেজে কোরআন রমজান মাস খেটে তারাবি পড়ান। অথচ বৃদ্ধ মায়ের ওষুধের টাকা জোগাতে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। মনে পড়ে ড. মো. শহীদুল্লাহর কথা- যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশে গুণী জন্মাতে পারে না। একজন হাফেজে কোরআন কেবল জাগতিক মেধা বা প্রতিভা নয়, ইহকাল-পরকাল উভয় জাহানের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা ও সফল বান্দা। তাই হাফেজদের আদর-কদর বোঝা এবং তাদের প্রতি রাষ্ট্রের এবং সমাজের সম্মান প্রদর্শন করা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + six =