‘অশ্লীল নাচ-গানে বাংলাদেশের দর্শকদেরকে অন্ধ করে রাখা হচ্ছে’

‘অশ্লীল নাচ-গানে বাংলাদেশের দর্শকদেরকে অন্ধ করে রাখা হচ্ছে’

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের বিশেষ ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র নির্মাতা, পরিচালক, খাতিমান অভিনেতা ও লেখক তৌকির আহমেদ বলেছেন, ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে ইরান অনেক ঋদ্ধ। তার প্রতিফলন এখানকার সমাজ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পড়েছে। রেডিও তেহরানের সাথে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেছেন।

তৌকির আহমেদ বলেন, ইরানি ছবি বিশ্ব বরেণ্য। কিন্তু বাংলাদেশের সিনেমার জন্য আমার দুঃখ হয়। সেখানে দর্শকদেরকে অশ্লীল নাচ-গানে অন্ধ করে রাখা হচ্ছে। তবে এর পরিবর্তন হবে বলে আমি আশাবাদী।

সম্প্রতি ইরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩৫তম ফাজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। সপ্তাহব্যাপী এ উৎসবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬৪টি দেশের পরিচালক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, নির্দেশক-প্রযোজক, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র কোম্পানি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং টিভি চ্যানেল মালিকরা যোগ দিয়েছিলেন। তৌকির আহমেদ এসেছিলেন তার নির্মিত ‘অজ্ঞাতনামা’ ছবি নিয়ে। ফাজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছে।

তৌকির আহমেদের সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা।

জনাব তৌকির আহমেদ, সম্ভবত ইরানে এটিই আপনার প্রথম সফর। তো কেমন লাগল আপনার কাছে ইরান?

তৌকির আহমেদ: জ্বি, এটাই প্রথম ইরান সফর। এ ট্রিপটা খুবই এক্সাইটিং; কেননা ইরানে কখনো আসা হয়নি। ইরান সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি অনেক ছোটবেলা থেকেই। বাস্তবে ইরান সম্পর্কে আমাদের জানা বা দেখা খুবই কম- সেটাই এখানে এসে মনে হচ্ছে। ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে ইরান অনেক ঋদ্ধ। ইরানের সমৃদ্ধ অতীতের প্রতিফলন দেশটির জাতীয় ও সমাজ জীবনে পড়ছে বলে জানান তিনি।

আপনি ফাজর চলচ্চিত্র উৎসবে এখানকার সিনেমা দেখলেন এর আগেও দেখেছেন। তো ইরানি চলচ্চিত্র সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

তৌকির আহমেদ: দেখুন, ইরানি ছবি বিশ্ব বরেণ্য। আর এটা এমনি এমনি হয়নি। আর ইরানি ছবি সম্পর্কে আমার এই মূল্যায়ন শুধু এখানে এসে ছবি দেখেছি বলেই করতে পারছি তা নয়, এর আগে যখন ইরানি সিনেমা দেখেছি তখনই বুঝেছি আসলে অনেক বেশি উন্নয়ন হয়েছে এখানকার ফিল্মের। কারিগরী দিক থেকে খুব নিখুঁতভাবে ছবি বানায় ইরানিরা। তাছাড়া ইরানি ছবিগুলোতে একটা মূল্যবোধ তুলে ধরে হয়। নতুন নতুন ভাবনা ও নতুন নতুন আইডিয়া এখানকার চলচ্চিত্রে দেখা যায়। সাধারণত আমরা প্রথাগত চলচ্চিত্রে যেসব বিষয় ভাবি না; ইরানিরা তাদের সিনেমায় সেসব বিষয় তুলে ধরছে। ইরান নিয়ে অনেকেই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন। তবে এই ভ্রান্ত ধারনার কারণ হচ্ছে পশ্চিমা প্রোপাগান্ডার। ইরানের যতটুকু নিজস্ব এবং ঋদ্ধ ঐতিহ্য আছে সেটা মূল্যায়ন করা জরুরি।

জ্বি তৌকির, আপনার নির্মিত ‘অজ্ঞাতনামা’ ছবিতে প্রবাসীদের কষ্টের চিত্র তুলে ধরেছেন। তো এ সম্পর্কে কিছু বলুন..

তৌকির আহমেদ: দেখুন, আসলে আমাদের ছবিগুলো হতে হবে আমাদের নিজস্ব গল্পের ভিত্তিতে বা আমাদের নিজস্ব জীবনের আলোকে। আমাদের গল্পের উত্থান হতে হবে আমাদেরই সংস্কৃতি থেকে। কিন্তু আমি দুঃখের সাথে বলতে চাই প্রায় ৪০/৫০ বছর ধরে আমাদের পরিচালকরা একই ধরনের বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনা নিয়ে বাণিজ্যিক ছবিগুলো বানাচ্ছেন। তবে হ্যাঁ গুটি কয়েক গুণী নির্মাতা অবশ্যই আমাদের দেশে আছে। আর এভাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নেয়া যাবে না। ফলে আমার বক্তব্য হচ্ছে আমাদের ছবিতে আমাদের নিজস্ব গল্পটাই তুলে ধরতে হবে। আর আমি আমার ছবিতে সে কাজটিই করেছি। আর যখন আমি আমার নিজের দেশের গল্প ছবিতে তুলে ধরব তখন বিদেশেও তার একটা আবেদন সৃষ্টি হবে।

জনাব, তৌকির আহমেদ-‘অজ্ঞাতনামা’র মতো ভিন্নধারার চলচ্চিত্রগুলো বাণিজ্যিকভাবে কতটা সফল।

তৌকির আহমেদ: না, ভিন্নধারার চলচ্চিত্রগুলো কোনোভাবেই সফল হয়নি। কারণ এগুলো ডিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের বাধা আছে। যারা ছবি ডিস্ট্রিবিউট করেন তারা এ ধরনের ছবি ডিস্ট্রিবিউশন করতেই চান না। কারণ তারা মনে করেন ভিন্নধারার ছবিগুলো তাদের ছবির মতো না।

তাদের ভয় ভিন্নধারার ছবিগুলো যদি একবার দর্শক দেখতে শুরু করে তাহলে তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবিগুলোর ব্যবসা মার খাবে। আমার কাছে এ বিষয়টি খুব নিষ্ঠুর মনে হয়। দেশের অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে একটি নিম্নরুচির ছবি চাপিয়ে দিয়ে ব্যবসায়ীরা পয়সা কামিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তারা একবারও চিন্তা করছেন না যে ভালো কিছু দেয়ার মাধ্যমে তার রুচিটাকে আরো উন্নত করা সম্ভব। আমরা চিন্তা করছি না যে চলচ্চিত্র একটি সমাজের কন্ট্রিবিউটরি মিডিয়াম হিসাবে কাজ করতে পারে। এখানে কিছু প্রযোজক ও পরিচালকের লাভের কথা চিন্তা করা হয়। জাতির মানসগঠনে চলচ্চিত্র, থিয়েটার এবং সংস্কৃতির অন্যান্য দিকগুলোকে আমরা ব্যবহার করতে পারি। আমার মনে হয় বাংলাদেশে সেই জায়গাটা পলিসিগতভাবে অনুপস্থিত। আর আমি বিশ্বাসকরি আমার ছবি ‘অজ্ঞাতনামা’ বা ‘রূপকথার গল্প’ এসব সাধারণ মানুষের গল্প। আর এরমধ্যে সাধারণ মানুষের বিনোদন আছে। কিন্তু সেই সাধারণ মানুষ এ বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারছে না। দর্শককে আবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে অশ্লীল নাচ-গান বা প্রথাগত কিছু ফাইট সিন, কিছু কমিক সিনধর্মী প্যাকেজের মধ্যে। এভাবে দর্শকদেরকে অন্ধ করে রাখা হচ্ছে। আর এই জায়গাটাতে আমি খুব দুঃখ পাই।

আচ্ছা, আপনি ভিন্নধারার ছবির বিষয়ে যেসব সমস্যার কথা বললেন- তা কাটিয়ে ওঠার জন্য ইরানের অভিজ্ঞতা কী বাংলাদেশে কোনো কাজে আসবে বলে আপনি মনে করেন..

তৌকির আহমেদ: দেখুন, আমি কিন্তু একটা কথা বারবার বলছি এখানে পলিসিগত সমস্যা। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। ইরানের ফিল্মের উন্নয়ন কিন্তু এই দুটো জায়গা থেকেই হয়েছে। ইরানের চলচ্চিত্র লাফ দিয়ে গাছে ওঠেনি। ইরানের বিপ্লবের পর সরকার নতুন ধারার চলচ্চিত্রের প্রয়াস চালিয়েছেন। ইনিসিয়েটিভ এবং ফান্ডিংয়ে রাষ্ট্রের একটা বড় ভূমিকা ছিল। ইরান সরকারের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ছিল যে তারা চলচ্চিত্র মাধ্যমটিকে জনগণের কাছে তুলে ধরবেন। শুরু থেকেই এখানে চলচ্চিত্র এক্সপ্লোর করেছিল। আর সেদিক থেকে বলব বাংলাদেশে যদি চলচ্চিত্রের দর্শনের জায়গাটা ঠিক করা না হয়, তাহলে একটা দিকভ্রান্ত নৌকার মতো এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে হবে। আমার মনে হয় আমাদের চলচ্চিত্রে এইসব জায়গায় বড় সমস্যা রয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের টিভি নাটক সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাইব।

তৌকির আহমদ: বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের একটা স্বর্ণযুগ চলে গেছে। একসময় অত্যন্ত ভালো ভালো কাজ সেখানে হয়েছে। আমি বলব শুধু উপমহাদেশেই নয়; বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে ভালো টেলিভিশন অনুষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিভিশন করে দেখিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এর নিয়ন্ত্রণটা নির্মাতা বা সৃজনশীলদের হাত থেকে চলে গেছে মধ্যস্বত্বভোগী একধরনের স্পন্সারদের হাতে বা একধরনের এজেন্সির হাতে। এটাকে এখন বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। নাটক নিয়ে এখন তাদের লক্ষ্য মূলত বাণিজ্য করা। একই লক্ষ্য চ্যানেলগুলোর। বেশীরভাগ চ্যানেল মালিকের উদ্দেশ্য তিনি অর্থলগ্নি করেছেন ফলে এরমাধ্যমে তিনি অর্থ উপার্জন করতে চান। তারা কোনোরকম কমিটমেন্টের জায়গায় নেই। আর কমিটমেন্ট না থাকলে শিল্পের ভবিষ্যত কী হতে পারে সেটার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে বর্তমানে বাংলাদেশের টিভি নাটক। টেলিভিশনগুলো এখন দর্শক হারিয়েছে এবং নাটকের মানও কমছে। কিছু কিছু ভালো নাটক হচ্ছে কিন্তু বিজ্ঞাপনসহ নানারকম পলিসির কারণে মানুষ সেসব ভালো নাটক দেখতেই পাচ্ছে না।

সবশেষে রেডিও তেহরানের শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে আপনি কি বলবেন?

তৌকির আহমেদ: দেখুন, আসলে মিথ্যে আশাবাদ দিয়ে তো কোনো লাভ নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা দেখেছি যে, একধরনের হানাহানি – হিংসা নির্ধারণ করে দিয়েছে পরবর্তী ইতিহাস ও দর্শন কিরকম হবে। কিন্তু অন্তত নিজের কথাটা বলার একটা জায়গা তৈরি করা দরকার। আমি যা করতে চাই সেটা করার চেষ্টা করা উচিত। তবে আমি আশাবাদী পরিবর্তন হবে একসময়। অন্তত রুচির জায়গাটা তো পরিবর্তন করা যেতেই পারে। শিক্ষা এবং রুচির জায়গাটা যদি পরিবর্তন হয় তাহলে হয়তো এটির মাধ্যমে সমাজ অনেকটা উপকৃত হবে।

সূত্র: পার্সটুডে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen − one =