আল-আন্দালুস আজ শুধুই স্মৃতি!

আল-আন্দালুস আজ শুধুই স্মৃতি!

লন্ডন,প্যারিসের রাস্তা যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল তখন মুসলিম শাসিত স্পেনের পেভমেন্ট করা রাস্তা মাইলের পর মাইল স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোয় আলোকিত থাকত।
ইউরোপের অন্য অংশে যখন টয়লেট ও গোসলখানার ব্যবস্থা ছিল না, তখনও মুসলিম শাসিত আল আন্দালুসের করডোভায় ৩০০ এর মত পাবলিক টয়লেট ছিল।

লন্ডনের মানুষ যখন মাটি আর কুড়ের ঘরে থাকত তখন শুধু করডোভাতেই ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার বিলাসবহুল ভবন ও ৭০০ মসজিদ।

ইউরোপের অন্য অংশ যখন অশিক্ষা আর কুসংস্কারে নিমজ্জিত তখন আল আন্দালুসে ছিল শত শত স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আর লাইব্রেরি। ইউরোপের অন্য অংশে যেখানে ৯০ ভাগ লোকই নিরক্ষর ছিল সেখানে আল আন্দালুসে শিক্ষাগ্রহণ ছিল সার্বজনীন। ইউরোপের বৃহৎ লাইব্রেরীতে যখন বই ছিল মাত্র ৬০০টি তখন করডোভাতেই প্রতি বছর ৬ হাজারেরও বেশি বই পাবলিশ করা হত।

কিন্তু সেই মুসলিম শাসিত আল-আন্দালুস আজ শুধুই স্মৃতি! সুদীর্ঘ প্রায় ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনের পর ১৪৯২ সালের ২রা জানুয়ারি আল-আন্দালুস আমাদের হাতছাড়া হয়।

৭ম শতাব্দীর ২য় দশকে আইবেরিয়া উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন এবং পর্তুগাল) জয় ছিল মুসলিমদের এক ঐতিহাসিক বিজয়। সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের জয় করা স্পেনকে মুসলমানরা নামকরণ করেছিল, আন্দালুসিয়া। ‘আন্দালুস’ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে নেওয়া। যার অর্থ- “গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেলে সবুজের সমারোহ”। যার রাজধানী ছিল কর্ডোভা।

সেই সময়কার স্পেনের কথা বলছি যখন লন্ডন সিটি স্ট্রিটে শুকর চড়ানো হত অর্থাৎ খৃস্টান জগতে তখনো সভ্যতার আলো পৌঁছেনি। ইউরোপের গণ-গ্রন্থাকার গুলো যেখানে বইয়ের অভাবে হাহাকার করছিল, সেখানে বিদ্যানুরাগী স্পেন সুলতান হাকাম প্রচুর অর্থ ব্যয় করে শত শত লোক নিয়োগ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং শহর থেকে প্রায় ছয় লক্ষ মূল্যবান এবং দূষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন এবং মহানগরী কর্ডোভাতে বিশাল এক গ্রন্থাকার স্থাপন করেছিলেন।

অন্ধকার ইউরোপে তৎকালীন আন্দালুসিয়া(স্পেন) ছিল আলোকবর্তিকা স্বরূপ। শিক্ষাব্যবস্থা ছিল খুবই উন্নত। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রস্থল এবং আবিষ্কার ও উদ্ভাবনী ক্ষমতায় ছিল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়। কর্ডোভার বিশাল বিজ্ঞানাগারে(Laboratory) ছাত্রদের কে আধুনিক যন্ত্রের(Instrument) মধ্যমে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এবং রাসায়নিক বিশ্লেষণ শিক্ষা দেওয়া হত।

সাধারণ মানুষের পড়ার জন্য সরকারী ভাবে শুধু মাত্র কর্ডোভা নগরীতেই সতেরটি বিশাল গণ-গ্রন্থাকার ছিল এবং গ্রন্থাগারের সাথেই পাঠকদের জন্য ছিল আধুনিক মান সম্পন্ন রিডিং রুম। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে দেওয়া বেসরকারি গণ-গ্রন্থাকারও ছিল প্রচুর। তথাপি ব্যক্তিগত লাইব্রেরী তো ছিলই।

শুধুমাত্র কর্ডোভাতেই ছিল বত্রিশটি কলেজ এবং ৫০০টি উচ্চ মান সম্পন্ন স্কুল। মহানগরী গ্রানাডাতেও ২০টি কলেজ এবং বহুসংখ্যক স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আন্দালুসিয়ার সুলতানরা এতই শিক্ষানুরাগী ছিল যে, যেই নতুন সুলতান হতেন তিনি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতেন। শিক্ষার জন্য ধনাঢ্য ব্যক্তি হতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যক্তিগণ পর্যন্ত স্ব-স্ব সম্পত্তির অধিকাংশ ওয়াকফ এবং অসিয়ত করে যেতেন। তৎকালে যে ব্যক্তির বাড়িতে ছাত্র জায়গীর(লজিং) এবং লাইব্রেরী না রাখতেন, তিনি অশিক্ষিত এবং নীচ হিসেবে সমাজে উপহাসের পাত্র হতেন। উল্লেখ্য, বালিকা এবং বালিকাদের জন্য স্বতন্ত্র স্কুল এবং কলেজ বিদ্যমান ছিল।

Alemulama.com+Picture2খলিফা হাকামের সময় প্রায় তিন লক্ষ ছাত্র এবং ছাত্রী কর্ডোভাতে অধ্যয়ন করত। ভূগোল শিক্ষার জন্য গোলক (Globe) এবং মানচিত্র ব্যবহৃত হতো। কর্ডোভার মানমন্দিরে(Observatory) বহুসংখ্যক নতুন যন্ত্র সংগৃহীত এবং নির্মিত হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আগমন করতেন;
জ্যোতির্বিদ্যার(Astronomy) আলোচনা এবং নক্ষত্রাদির গতি নির্ণয় করতেন। মুসলিম বিজ্ঞানীরা প্রায় ২০০ টি তারকার আরবি নামকরণ করেছিলেন।

ঘটিকা-যন্ত্রের(Hour-machine) দোলক(pendulum) এবং টেলিগ্রামের উদ্ভাবন এখানেই সর্বপ্রথম হয়। এখানেই সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের(Instrument) সাহায্যে ৩২ ফুট উঁচু পর্যন্ত পানি উত্তোলন করা হয়।

কর্ডোভাতে চিকিৎসাবিদ্যার আশাতীত উন্নতি লাভ করেছিল। জালিনুসের (Galen বা Aelius Galenus,) পরে চিকিৎসা-শাস্ত্রের ভেষজ-তত্ত্ব(therapeutic theory), রোগ-নির্ণয় এবং শরীর-বিদ্যার(Anatomy) নানা-বিধ অজ্ঞাত এবং দুর্জেয় তত্ত্ব এখানে আবিস্কৃত হয়।

একাদশ শতাব্দীর সুপ্রসিদ্ধ চিকিৎসক আবুল কাশেম (Albacasis) এখানেই অস্ত্র-চিকিৎসার(surgical treatment) উপর অবদান রেখে ছিলেন। তাঁর অস্ত্র-চিকিৎসার পদ্ধতি ছিল আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত। তাঁর কিছুদিন পরে বিশ্ব বিখ্যাত চিকিৎসক ইবনে জোহরের (Avenzoar) আবির্ভাব ঘটে এখানেই। তিনি বিভিন্ন ধরনের প্রকারের ঔষধ এবং অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছিলেন। আন্দালুসিয়ার সার্জনরা প্রায় ২০০টি অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করত। ১৩০টি শুধুমাত্র চোখের রোগের বর্ণনা দেন।
প্রসিদ্ধ উদ্ভিদবিজ্ঞানী(Botanist) ইবনে বতহেরের জন্ম এখানেই। তিনি ঔষধসংক্রান্ত গাছ-গাছড়ার পরীক্ষার জন্য এশিয়া এবং আফ্রিকার বহু দেশ ভ্রমণ করেছিলেন এবং ভেষজ ঔষধ সম্পর্কিত বিশাল গ্রন্থ রচনা করেছিলেন । সুপ্রসিদ্ধ ইহুদী চিকিৎসক হাসেদাইও কর্ডোভার আবিষ্কার। প্রসিদ্ধ দার্শনিক ইবনে রোশদ (Avenrose) আজ ইউরোপের গৌরবস্তম্ভ। ইউরোপের আধুনিক দার্শনিকগণ প্রায় সকলেই ইবনে রোসদের নিকট ঋণী। সক্রেটিস এবং এরিস্টটলের দর্শন তত্ত্বের তিনিই সর্বপ্রথম জ্ঞানগর্ভ বিস্তৃত সমালোচনা করে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

আরবী সাহিত্যে এবং ইতিহাস রচনায় আন্দালুসিয়া চরম উন্নতি লাভ করেছিল। ইতিহাস লেখা হত খুবই পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে। স্পেনের ইতিহাস নিয়ে ৭০ খন্ডে রচিত বিশাল গ্রন্থ আজো মাদ্রিদ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।

টেকনোলজিতে ইউরোপ অনেক উন্নতি করিলেও, সৌন্দর্য, স্থায়িত্ব এবং দৃঢ়তায় আন্দালুসিয়ার রাসায়নিক শিল্প এখনও তাদের কাছে বিস্ময়। বস্ত্র শিল্প এখানে চরম উন্নতি লাভ করেছিল। রেশম কাপড় বোননে আন্দালুসিয়া পৃথিবীকে বিমুগ্ধ করেছিল। এখানে রেশমের নানা ধরনের সূক্ষ্ম এবং মসৃণ বস্ত্র প্রস্তুত হত এবং ইউরোপের খ্রিস্টান রাজধানীগুলোতে রপ্তানি করা হত। সমীক্ষায় দেখা যায়, এক কর্ডোভাতেই কমপক্ষে এক লক্ষ ৩০ হাজার তাঁতী কাপড় বুননে নিযুক্ত ছিল। আলমোরিয়া নগরে সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট গালিচা এবং সূক্ষ্ম বস্ত্র প্রস্তুত হত।

ধাতব এবং মাটির তৈরি জিনিসের অনেক উন্নতি লাভ করেছিল। তামা, কাঁসা, মাটি এবং পিতলের তৈরি বাসন-শিল্পে আন্দালুসিয়ার কারিগরগণ অভূতপূর্ব দক্ষতা অর্জন করেছিল। মেজর্কা দ্বীপের বাসন-কোসন ইউরোপ এবং আফ্রিকার নগর-বন্দরে প্রচুর চাহিদা ছিল। পরবর্তী সময়ে এই মেজর্কা দ্বীপের মাটির বাসন-শিল্প ইটালীতে মেজলিকা নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে। আলমোরিয়াতে লোহা, কাঁসা এবং কাচেঁর বিভিন্ন প্রকারের আসবাব-পত্র তৈরি হত। আলমোরিয়াতে একটি কাঁচের কারখানায় খুবই উন্নত মানের বিভিন্ন প্রকারের ঝাড়, ফানুস, লন্টন এবং পানপাত্র প্রস্তুত হত। হস্তিদন্তের খোদাই-শিল্প চমৎকার সৌন্দর্য এবং সূক্ষ্মতা লাভ করেছিল।। হস্তিদন্ত-নির্মিত মণিমুক্তা খচিত পানপাত্র ইউরোপীয় রাজন্যবর্গের নিকট অত্যন্ত প্রিয় বস্তু ছিল। স্পেনের সুলতান এবং আমীরগণের চমৎকার কারুকাজ সম্পন্ন তরবারির বাঁটগুলো এখনও ইউরোপের বিভিন্ন যাদুঘরে শোভা পাচ্ছে। ধাতুশিল্পে কর্ডোভার শিল্পীগণ চমৎকার দক্ষতা দেখিয়েছেন। সামান্য চাবি এবং তালাগুলি পর্যন্ত কারুকার্য শোভা পেত। আলমোরিয়া, সেভিল, টলেডো, মর্সিয়া এবং গ্রানাডা যুদ্ধাস্ত্রের জন্য বিখ্যাত ছিল। টলেডোর তলোয়ার এবং খঞ্জর ছিল খুবই মূল্যবান।

আন্দালুসিয়ার মুসলমানদের উৎপাদিত এবং ব্যবহৃত আসবাব-পত্র এবং যন্ত্রপাতিগুলো দেখে আশ্চর্য হতে হয়। মনে হবে একুশ শতকের আধুনিক কোন দেশের বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে। অল্প কিছু উৎপাদিত পণ্যের বর্ণনা দেওয়া হল, কটন, পেপার, আয়না, স্ট্রিট ল্যাম্প, সল্ট, সিল্ক, সাটিন-কাপড়(satin), মরিচ, দারুচিনি, রুমাল, দুর্গন্ধনাশক(deodorant), Carrasyn Medicine, লিনেন, আগ্নেয়াস্ত্র, কটন বল, কাগজের টাকা, ডাকটিকিট, বুক বাইন্ডিং, ঘড়ি, সিরামিক টাইলস, নাইট্রিক এসিড, সাবান, এস্টো ল্যাবরেটরি, নাবিকদের জন্য কম্পাস, স্লাইড রুলস, রোলার, অস্ত্রোপচার যন্ত্র, ওয়াইন্ড মিল(windmill), চরকা(spinning wheel), গোলাপ জল, মানচিত্র, গোলক, সাইট্রিক, ফলের জুস, কার্পেট, চশমা, পর্দা, মশারি, টেস্ট টিউব, চীনামাটির বাসন, সূক্ষ্ম পশম, মখমল, বর্ষ-পঞ্জিকা এবং বিশ্ব-কোষ।
আন্দালুসিয়ার মুসলমানদের স্থাপত্য শিল্পের ব্যাপারে আমি আর কি বলব। আলহামরা প্যালেস সম্পর্কে সরোজিনী নাইডু বলেছেন, তাজমহলের চেয়ে অধিকতর অনিন্দসুন্দর। ঐতিহাসিক স্যার আমীর আলী যার সম্পর্কে বলেছেন, আলহামরার দৃশ্য বর্ণনা অত্যন্ত শক্তিশালী কলমের দ্বারাই শুধু সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × four =