আমরা জেনারেল শিক্ষাকে অস্বীকার করতে পারি না

আমরা জেনারেল শিক্ষাকে অস্বীকার করতে পারি না

মাওলানা মুস্তাকিম বিল্লাহ হামিদী। জামিয়া ইসলামিয়া তালিমুস সুন্নাহর দক্ষিণ মুগদা ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল। বায়তুল ফালাহ শাহী জামে মসজিদের খতীব। দীর্ঘদিন ধরেই মাদরাসার দরসের সঙ্গে যুক্ত আছেন।

২০০২ সালে কওমি মাদরসা থেকে দাওরায়ে হাদিস সমাপণের পর থেকেই মসজিদ মাদরাসার সঙ্গে কাজে জড়িত। সম্প্রতি মাদরাসা শিক্ষা, হিফজ বিভাগ ইত্যাদি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন নানা বিষয়। আওয়ার ইসলামকে দেয়া তার সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পড়ুন-

বাংলাদেশে কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যাবস্থা এবং জেনারেল শিক্ষাব্যাবস্থার মধ্যে যে দূরত্ব এর কারণ কী?
জেনারেল শিক্ষা বা ইংরেজি শিক্ষার সাথে কওমি মাদরাসা শিক্ষার শুরুর দিকে একটা সমন্বয় ছিল। কিন্ত এক সময় দেখা যায় ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অধিক আগ্রহী হওয়ার কারণে মাদরাসা শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিল। তখন দ্বীনি শিক্ষার পরিপূর্ণ বিকাশে দুই শিক্ষার মাঝে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। যা এখনো বিদ্যমান।

এখন যে কওমি ছাত্ররা বিভিন্নভাবে কওমি শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হচ্ছে, সরকার কর্তৃক কওমি মাদরাসা শিক্ষার স্বীকৃতির ঘোষণাও এসেছে আলেমরাও গ্রহণ করেছে এটা কি আগের অবস্থান থেকে সরে আসা নয়?
আসলে সময়ের প্রেক্ষাপটে আমরা জেনারেল শিক্ষাকে অস্বীকার করতে পারি না। কোনো এক সময় এমন হবে জেনারেল শিক্ষা না থাকায় কওমি পড়ুয়ারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে এটা আমাদের জন্য বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মৌলিক অধিকার থেকে আমাদের বঞ্চিত থাকতে হতে পারে। সেজন্য নিজেদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সরকারি স্বীকৃতি বা জেনারেল শিক্ষাকে আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। সুতরা এটাকে আমি আগের অবস্থান থেকে সরে আসা বলব না, বরং সময়ের চাহিদানুযায়ী প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি বলব।

হেফজ বিভাগ সম্পর্কে কিছু বলুন
হেফজ বিভাগ হলো আল্লাহ তাআলার গায়েবি খাজানার সাথে কওমি মাদরাসাগুলোর সম্পর্ক অটুট রাখার মাধ্যম। কেননা গভীর রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে পৃথিবী যখন নিস্তব্ধ হয়ে যায় হেফজ বিভাগের ছাত্ররা তখন ঘুম থেকে উঠে অযু করে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে। তারপর সবাই মহান আল্লাহর কালাম পবিত্র কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতে থাকে।

হেফজ বিভাগ পরিচালনার ক্ষেত্রে মাদরাসার মুহতামিম হাফেজ না হলে কী সমস্য হতে পারে?
হেফজ বিভাগ পরিচালনার ক্ষেত্রে মুহতামিমের হাফেজ হওয়া না হওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। কেননা প্রত্যেকটা বিষয়ই সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞতার একটা প্রয়োজনীয়তা আছে। সেক্ষেত্রে হেফজ বিভাগ পরিচালনার ক্ষেত্রে মুহতামিম যদি হাফেজ না হন তার জন্য দুইটি উপায় রয়েছে।

প্রথমত, হেফজ বিভাগের উন্নতি ও পাঠদান-পরিচালনা পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তির পরামর্শ নেয়া। দ্বিতীয়ত, হেফজ বিভাগ তদারকির জন্য এমন একজন যোগ্যতা সম্পন্ন হাফেজ নিয়োগ করতে হবে যিনি পুরো বিভাগ সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে এমন ব্যক্তি নির্বাচন করতে হবে যিনি শতভাগ আন্তরিবতার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে বর্তমানে হেফজ বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে অতিরিক্তি মোবাইল আসক্তির প্রবনতা লক্ষ্য করা যায় যেটা একটা বড় সমস্যা। দেখা যায় উস্তাদ মোবাইলের প্রতি মগ্ন থাকায় উস্তাদের চোখের সামনে থেকেও ছাত্ররা পড়ে না।

কওমি মাদরাসার ছাত্রদের মধ্যে বিশেষ করে হেফজ বিভাগের ছাত্রদের মধ্যে ঝরে পড়ার সংখ্যা বেশি এর কারণ কী?

শিক্ষক ছাত্রদের মধ্যে সম্পর্কের ঘাটতির কারণেই এটা হয়ে থাকে। অনেক ছাত্র আছে হেফজের জন্য উপযোগী না। তারা এক সময় বিরক্ত হয়ে ঝরে পড়ে। এজন্য এদের চিহ্নিত করে কিতাব বিভাগে পাঠানো হলে ঝরে পড়ার হার কমে আসবে। এছাড়া একজন আদর্শ ছাত্রের জন্য দুইজন মুরুব্বি থাকা চাই। একজন তালিমি মুরুব্বি এবং একজন রুহানি মুরুব্বি। প্রত্যেক ছাত্রের তালিমি মুরুব্বি থাকলে ঝরে পড়ার হার কমে যাবে।

সাধারণদের অভিযোগ কওমি পড়ুয়া আলেম বা ছাত্ররা সমাজ থেকে পিছিয়ে। সমাজ পরিচালনা, রাষ্ট্র ব্যাবস্থা, রাজনীতি, অর্থণীতি সব দিক থেকেই পিছিয়ে আসলেই কি তাই? বা এর কারণ কী?

আসলে আপাতত দৃষ্টিতে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। মূলত সমাজেরই একটি ঈর্ষাকাতর শ্রেণি কওমি আলেমদের সমাজ থেকে পিছিয়ে রাখতে চায়। এক্ষেত্রে আমাদেরও দূর্বলতা রয়েছে। বাস্তবিকভাবে যদি সর্ব ক্ষেত্রে সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ হয় তাহলে কওমি পড়ুয়ারাই এগিয়ে থাকবে।

আমাদের সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ
আপনাকেও ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − 7 =