শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা

শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা

একজন শ্রমিকের জীবন ধারণের একমাত্র অবলম্বন হলো তার মজুরী। কেবলমাত্র খেয়ে পরে বাঁচার তাকিদেই তিনি সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত শরীরের রক্ত পানি করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যান।

মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হলো অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান। আর তা লোকভেদে ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। একজন ডাক্তার, প্রকৌশলী বা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মৌলিক প্রয়োজন প্রায় সমান। তবে তাদের এমন কিছু প্রয়োজন রয়েছে, যা সাধারণ শ্রমিকের বেলায় দরকার হয় না। কাজেই প্রয়োজনবোধে ইসলাম তাদের সেই চাহিদার প্রতি সমর্থন দিতে দ্বিধা করে করে না। অর্থাৎ- শ্রমিকের যোগ্যতা এবং মৌলিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে ইনসাফপূর্ণ মজুরী দেয়। এমন কি একজন শ্রমিকের পোষ্যের উপর দৃষ্টি রেখেও তার বেতন নির্ধারণ করা হয়।

ইসলামের সোনালী যুগে শ্রমিকের পারিশ্রমিক তার কাজের ধরণ ও সময়ের উপর নির্ধারণ করা হতো। তাদেরকে পারিশ্রমিক এমন দেয়া হতো, যেন তা দ্বারা প্রয়োজন পুরণের পর বিপদ-আপদ ও জরুরী প্রয়োজন মোকাবেলা করতে পারে এবং বৈধ আমোদ-আনন্দ তথা চিত্ত বিনোদনও করতে পারে। ইসলামের সোনালী দিনে মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রে বেতন ভাতার তেমন একটা পার্থক্য ছিল না। যোগ্যতা, ত্যাগ ও বীরত্বে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও গণিমতের মাল মুজাহিদদের মধ্যে সমহারে বণ্টন করা হতো।

ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রাযি.) এবং দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রাযি.) সাধারণ নাগরিকের সমপর্যায়ের ভাতা গ্রহণ করতেন। হযরত উমর (রাযি.) খলীফা হয়ে এক ভাষণে বলেন, “আমি যদি স্বচ্ছল হই তবে কোনই পারিশ্রমিক নেব না। আর যদি অস্বচ্ছল হই তাহলে ন্যায্য পারিশ্রমিক নেব”। তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান (রাযি.) ধনী ছিলেন বিধায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তিনি কোন ভাতা গ্রহণ করতেন না। চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রাযি.) সাধারণ পর্যায়ের ভাতা গ্রহণ করতেন।

ইসলাম হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধ, ইনসাফ-বেইনসাফ, অধিকার-অনধিকার প্রভৃতির প্রতি সযত্ন দৃষ্টি রাখে। আর তাই শ্রমিকের ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করে, অধিকার সমুন্নত করে, স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষা করে, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন এবং সকল প্রকার মানবিক নিরাপত্তা প্রদান করে।

ইসলাম শ্রমিক মালিক ভাই ভাই ভিত্তিতে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি ন্যায্য অধিকার পুরণে তাগিদ দেয়। বলা হয়েছে-
“তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ্ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তোমরা যা খাবে, তোমরা যে কাপড় পরিধান করবে তাদেরকেও তা খাওয়াবে ও পরিধান করাবে। যা তাদের জন্য কষ্টকর তা করাবে না”। (বুখারী শরীফ)।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি.) বলেছেন, এক ব্যক্তি নবী করিম (স:) এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল হে আল্লাহর রাসূল (সা.) চাকর-বাকরকে কতবার ক্ষমা করব ? তিনি চুপ রইলেন। সে পুনরায় তাঁকে প্রশ্ন করলে এবারও তিনি চুপ রইলেন। সে পুনরায় তাঁকে প্রশ্ন করলে এবারও তিনি চুপ রইলেন। চতুর্থবার বলার পর তিনি বললেন দৈনিক সত্তর বার ক্ষমা করবে। ( আবুদাউদ শরীফ)।

আরো বলা হয়েছে- “শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও”।
ইসলাম বেকার, পঙ্গু, অসহায়, আশ্রয়হীন, বিধবা, রোগী, চাকুরীচ্যুতদের খাওয়া, পরা, চিকিৎসা, বাসস্থান, বিয়ে শাদী ও লেখা পড়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

ইসলাম শ্রমিকদের উৎপাদিত পণ্যের লভ্যাংশ দিতে চায়। হাদীস শরীফে এসেছে- “শ্রমিককে তার শ্রমের উৎপাদিত পণ্যের অংশ দাও। কেননা, আল্লাহ্ তায়ালা শ্রমিককে কোন অবস্থাতেই বঞ্চিত করতে চান না”।

উল্লেখ্য, পুঁজিবাদী শ্রমনীতিতে লভ্যাংশ মালিকের, আর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় লভ্যাংশ কমরেডদের। আর ইসলামী শ্রমনীতিতে লভ্যাংশ মালিক শ্রমিক উভয়েরই। ইসলাম শ্রমিককে লভ্যাংশ প্রদান করে বিধায় শ্রমিক কোন প্রতিষ্ঠান বা কারখানাকে অন্যের মনে করে না, বরং আপন মনে করে। কেননা, সে জানে প্রতিষ্ঠানের উন্নতি অবনতির সাথে তার স্বার্থ জড়িত আছে। আর তাই সে মনে প্রাণে উৎপাদন বাড়াতে সচেষ্ট হয়।

বর্তমানে আমাদের দেশ ও ভারতসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই শ্রমিকদের প্রাপ্য ন্যায্য অধিকার পুঁজিবাদী শ্রমনীতির হাতে বন্দী। স্মর্তব্য, পুঁজিবাদী মালিকেরা শ্রমিকদেরকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করলেও খেটে খাওয়া শ্রমিকদের প্রতি ন্যায্য দৃষ্টি রাখে না। অর্থাৎ তাদের ন্যায্য বেতন তো দেয় না। এমনকি তাদের সুখ-সুবিধার দিকেও নজর রাখে না।

সঙ্গত কারণে কম বেতন ভুক্ত শ্রমিক কর্মচারিরা রাত-দিন হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও অনাহারে, অর্ধাহারে ও চিকিৎসাহীন অবস্থায় জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়। ছেলে মেয়েদেরকে পেটপুরে খেতে দিতে পারে না। শিক্ষার খরচের যোগান দিতে পারে না। অর্থাভাবে সন্তানদের সৎপাত্রে বিয়ে শাদীর ব্যবস্থা করতে পারে না। ফলশ্রুতিতে মালিকের প্রতি ঘৃণা, ক্ষোভ, অসন্তোষ অবিশ্বাস ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। শারীরিক দুর্বলতা ও মানসিক অশান্তির কারণে শ্রমিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের নির্ধারিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারে না। আর তাই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন তথা আয়ও বৃদ্ধি পায় না। আর যেটুকুই আয় হয় তার সিংহভাগই মালিকের পকেটে চলে যায়।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল নিম্ন আয়ের দেশ। এখানে সম্পদের স্বল্পতা, জাতীয় পর্যায়ে নৈতিকতা চর্চার অনুপস্থিতি, সুষ্ঠূ পরিকল্পনা ও পরিচালনার অভাবসহ নানা সমস্যা বিদ্যমান। সর্বোপরি কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রের কারণে এবং ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর স্বার্থপরতার কারণে শ্রমিকদের মৌলিক সমস্যা দূর করতে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ, অথচ কৃষকদেরকে প্রয়োজন মত উপযুক্ত বীজ, সার, কৃষি সরঞ্জাম, কীটনাশক, প্রয়োজনানুপাতে সুদমুক্ত কৃষি ঋণ দেয়া হয় না। কৃষকদের সমস্যার সমাধানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর কোন যত্ন দেওয়া হয় না। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করার বাস্তবমুখি পরিকল্পনা ও উদ্যোগ দেখা যায় না। এদিকে সুষ্ঠু পরিচালনার অভাবে দেশের অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অগণিত নিম্ন ও মাঝারি ব্যবসায়ী দিন দিন ব্যবসার পুঁজি হারাচ্ছে। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কাজেই এ মুহূর্তে দেশের সার্বিক উন্নতি চাইলে ইসলামী শ্রমনীতি চালু করার বিকল্প কিছু নেই।


লেখক: প্রেসসচিব, হেফাজত আমীর শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী,
এবং নির্বাহী সম্পাদক: মাসিক মুঈনুল ইসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four + one =